আমাদের বাউফলরাজনীতি

বাউফল আওয়ামী লীগ দুই নেতার বৈরিতা

বাউফল উপজেলা নিয়ে পটুয়াখালী-২ সংসদীয় আসন। সংসদ সদস্য আ স ম ফিরোজ। তিনি জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য এবং উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি। একাধারে জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ। আর বাউফলের পৌর মেয়র জিয়াউল হক জুয়েল। তিনি জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক।

একই দলের হলেও জুয়েল তরুণ আর ফিরোজ প্রবীণ রাজনীতিবিদ। তাই দুই ধারায় বিভক্ত নেতাকর্মীরা। দুজনের কেউ কাউকে ছাড় দিতে নারাজ। এ কারণে দুজনের কর্মী-সমর্থকরা প্রায়ই সংঘাত-সহিংসতায় জড়াচ্ছে। গত তিন বছরে দুই পক্ষে শতাধিক সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। ঘরবাড়ি, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ভাঙচুর, লুটপাট, মারামারিসহ দুই নেতার চার কর্মী এ পর্যন্ত খুন হয়েছেন। মামলা-পাল্টামামলায় আসামির সংখ্যা হাজার ছুঁয়েছে।

শত্রুতা শুরু : ফিরোজ দলীয় সমর্থনে পাঁচবার এবং বিদ্রোহী হয়ে একবার এমপি নির্বাচিত হয়েছেন। এ কারণে দীর্ঘদিন ধরে উপজেলা আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। ছিল একক কর্তৃত্ব। তবে মাঝেমধ্যে সংসদ নির্বাচনে দু-একজন প্রার্থী মনোনয়নের জন্য দৌড়ঝাঁপ করে ব্যর্থ হয়ে ফিরে গেছেন। ফিরোজের সেই আধিপত্যে ফাটল ধরিয়েছেন জুয়েল।

২০১২ সালের মে মাসে অনুষ্ঠিত বাউফল পৌর নির্বাচনে মেয়র পদে আওয়ামী লীগের সমর্থন চান কেন্দ্রীয় স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা জুয়েল। কিন্তু ফিরোজ তাঁর পরিবর্তে সমর্থন দেন স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা গোলাম কিবরিয়া পান্নুকে। ওই নির্বাচনে বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে জয়ী হন জুয়েল। নির্বাচনের পর জুয়েল এমপির ঘনিষ্ঠ হতে চেয়েছিলেন। একাধিকবার দলীয় কার্যালয়ে গিয়েছিলেন; কিন্তু ফিরোজ তাঁকে সে সুযোগ দেননি। ফলে শুরু হয় শত্রুতা।

এরপর জুয়েল তাঁর কর্মী-সমর্থক বলয় বাড়াতে থাকেন। একে একে তাঁকে সমর্থন দেন উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মজিবুর রহমান। উপজেলা ছাত্রলীগ, আওয়ামী লীগ, যুবলীগ স্বেচ্ছাসেবক লীগ, কৃষক লীগ ও শ্রমিক লীগের একটি অংশ তাঁর হয়ে কাজ করছে। ফলে নেতাকর্মীর সংখ্যা ক্রমেই বাড়ে। বাড়ে দ্বন্দ্ব।

২০১৩ সালে উপজেলা আওয়ামী লীগের সর্বশেষ কমিটি গঠনের সময় দ্বন্দ্ব আরো স্পষ্ট হয়। তখন ফিরোজকে সভাপতি করে বাউফল উপজেলা আওয়ামী লীগের একটি কমিটি জমা দেওয়া হয় পটুয়াখালী জেলায়। পক্ষান্তরে মেয়র জুয়েলও পাল্টা আরেকটি কমিটি জমা দেন। এর কিছুদিন পর আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার উপস্থিতিতে তৃণমূল নেতাকর্মীদের বৈঠকে ফিরোজের বিরুদ্ধে সরাসরি অভিযোগ করেন জুয়েল। এ ছাড়া ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে এমপি পদের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে উচ্চ আদালতে মামলা করেন। এর পর থেকে এ দুজনের দ্বন্দ্ব প্রকট আকার ধারণ করে। ২০১৬ সালের মার্চে ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনে দুই পক্ষ প্রায়ই হামলা-সংঘর্ষে জড়ায়। তখন নিহত হন দুই পক্ষের তিনজন। তাঁরা হলেন আশরাফ ফকির, হুমায়ুন মল্লিক ও দীনবন্ধু হালদার। এর মধ্যে দুজন ছিলেন হুইপ সমর্থক এবং একজন মেয়র সমর্থক।

সর্বশেষ গত ২১ এপ্রিল দুই পক্ষের সংঘর্ষে প্রাণ গেছে নওমালা ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য রফিকুল ইসলাম রফিকের। তিনি জুয়েল সমর্থক। এ হত্যাকাণ্ডের পর পাল্টাপাল্টি সংবাদ সম্মেলন করে একে অন্যকে দোষারোপ করেন।

ফিরোজ বলেন, ‘বাউফলের সাম্প্রতিক সব সংঘাত-সংঘর্ষের জন্য জুয়েল দায়ী।’ পক্ষান্তরে জুয়েল বলেন, ‘ফিরোজ এ উপজেলাকে মাদকের আখড়া বানিয়েছেন। যত মাদক কারবারি আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে আটক হয়, সব লোকই তাঁর। এ ছাড়া এলাকার উন্নয়নের পরির্বতে তাঁর ভাগ্যোন্নয়ন হয়েছে।’

মামলা : দুই পক্ষের হামলা-পাল্টাহামলার ঘটনায় প্রায় ১০০ মামলা ঝুলছে নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে। উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতি সাইদুর রহমান হাসান বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে এ পর্যন্ত ১৬টি মামলা করেছে চিফ হুইপের লোকজন।’ সাধারণ সম্পাদক মাহমুদ রাহাত জমশেদ বলেন, ‘আমি আট মামলার আসামি।’

বাউফল উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য মজিবুর রহমান বলেন, ‘আমার ওপর দুবার হামলা হয়েছে। লাঞ্ছিত করা হয়েছে। আমার বিরুদ্ধে একটি মিথ্যা মামলা করেছে।’

বিব্রত প্রশাসন : গত ২৫ ফেব্রুয়ারি বাউফল থানা ভবন উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানের উপস্থিতিতে হুইপ ও মেয়র পক্ষ সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। এর আগে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে আইন-শৃঙ্খলা সভায় জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারের উপস্থিতিতে হুইপের লোকজন মেয়র অনুসারীদের ওপর হামলা চালায়। জেলা পুলিশের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘বগা ও কালাইয়ার নেতাকর্মীরা প্রকাশ্যে হঠাৎ করে বাউফল পৌর শহরে যেভাবে দেশি অস্ত্রসহ জনমনে ভীতি ছড়ায় তা আমাদের জন্যও বিব্রতকর।’

এ নিয়ে উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মোতালেব হাওলাদার বলেন, ‘বাউফল আওয়ামী লীগের দুর্গ। মূলত বিএনপি-জামায়াতকে সুবিধা দিতে মেয়র জুয়েল পরিকল্পিতভাবে বাউফলকে অশান্ত করে রেখেছেন।’

বাউফল উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান বলেন, ‘ফিরোজ দীর্ঘদিন ধরে বাউফল আওয়ামী লীগকে খেয়ালখুশিমতো ব্যবহার করেছেন। সব সময় পকেট কমিটি দিয়ে চলছে। সর্বশেষ ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে ঋণখেলাপির দায়ে মনোনয়ন বাতিলের আশঙ্কায় ছেলেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী করেছেন। বাউফলের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি অবনতির জন্য ফিরোজ দায়ী।’

সূত্র:কালের কন্ঠ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *