আমাদের বাউফলকনকদিয়াকাছিপাড়াকালাইয়াকালিশুরিকেশবপুরদাশপাড়াধূলিয়ানওমালানাজিরপুরবগামদনপুরারাজনীতিসূর্যমনি

বাউফলে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির ছত্রছায়ায় বেপরোয়া কিশোর গ্যাং

ডেস্ক নিউজ: গত এক বছরে বাউফলে কিশোর গ্যাং ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় কিশোররা নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে ব্যবহৃত হচ্ছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাদের অপরাধের ধরনও পাল্টে যাচ্ছে। এলাকায় আধিপত্য বিস্তার, চুরি-ছিনতাই, মাদক সেবন, মাদক ব্যবসা, সিনিয়র-জুনিয়র দ্বন্দ্ব, প্রেমঘটিত দ্বন্দ্ব ও হত্যাসহ নানা অপরাধে কিশোর-তরুণরা জড়িয়ে পড়ছে। যাদের অধিকাংশই স্কুল ও কলেজের ছাত্র।

সম্প্রতি বাউফলে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি কয়েকটি গ্রুপে বিভক্ত হয়ে দলের নেতাদের ছত্রছায়ায় উঠতি বয়সি এসব কিশোর বেপরোয়া হয়ে উঠছে।জানা গেছে, উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের হামলায় আহত হয়েছেন শতাধিক মানুষ। ২০২০ সালের ২ আগস্ট যুবলীগ নেতা হত্যার ঘটনায়ও কিশোর গ্যাং সম্পৃক্ত ছিল। এ ছাড়া ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচন চলাকালীন ও নির্বাচন পরবর্তী সময়ে ব্যাপক তাণ্ডব চালায় কিশোর গ্যাং।

এদিকে কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণে পুলিশ যথাযথ ভূমিকা নিচ্ছে না বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। উপজেলার সাবেক মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার আবুল কালাম খান বলেন, কিশোর-তরুণদের উৎপাতে রাস্তাঘাটে চলা দায়। তাদের চলাফেরা বেপরোয়া। অভিভাবকদের উচিত, তাদের সন্তানদের বিষয়ে খেয়াল রাখা। কোথায় যায়, কার সঙ্গে মেশে সে বিষয়ে খবর নেওয়া। একই সঙ্গে জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের কিশোর অপরাধ নিয়ন্ত্রণে সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য প্রচারণা চালানো উচিত।

এ বিষয়ে বাউফল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আল মামুন বলেন, কিশোর অপরাধ নিয়ন্ত্রণে পুলিশ কাজ করছে। যেকোনো অভিযোগ পেলে পুলিশ যথাযথ ব্যবস্থা নেয়। পুলিশের একার পক্ষে কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণ সম্ভব না। অভিভাবক, জনপ্রতিনিধি, শিক্ষকসহ সচেতন মহলের এগিয়ে আসতে হবে।

জানা গেছে, বাইসাইকেল থেকে নামার সময় পায়ে পা লাগা নিয়ে ইন্দ্রকুল বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির এক ছাত্রের সঙ্গে নবম শেণির এক ছাত্রের বিবাদ হয়। এ ঘটনায় মারামারি হলেও তা পরে মীমাংসা করে দেওয়া হয়। এই ঘটনার জেরে এক পক্ষ অপর পক্ষের ওপর হামলা করে। এ সময় ছুরিকাঘাতে দুই ছাত্র নিহত ও সিয়াম নামের একজন আহত হয়।

কিশোর গ্যাংয়ের হামলায় স্কুলছাত্র মো. নাফিস মস্তফা আনসারী ও মো. মারুফ হোসেন বাপ্পী নিহত হওয়ার এ ঘটনার ২৪ ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি। এতে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন নিহতদের পরিবার, সহপাঠী ও শিক্ষকরা।

জড়িতদের গ্রেপ্তার ও ফাঁসির দাবিতে বৃহস্পতিবার সকালে বিক্ষোভ মিছিল ও মানববন্ধন করেছেন ইন্দ্রকুল মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শতাধিক শিক্ষার্থী ও শিক্ষক।

থামছে না দুই পরিবারের আহাজারি

মো. নাফিস মস্তফা আনসারী ইন্দ্রকুল গ্রামের মো. মিরাজ মস্তফা আনসারী ও মোসা. নার্গিস আক্তার দম্পতির একমাত্র ছেলে। তিন সন্তানের ছোট নাফিস। নাফিস ইন্দ্রকুল প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে প্রাথমিকে ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি পায়। গতকাল নাফিসের বাড়ি গিয়ে দেখা যায়, একমাত্র সন্তানকে হারিয়ে শোকে পাথর হয়ে গেছেন বাবা। শুধু বলছেন, ‘আমার মানিককে এনে দেও।’ মা নার্গিস আক্তার সেটুকও বলতে পারেন না। একটু পরপর ‘আমার কালাচাঁন কাই’ বলে জ্ঞান হারিয়ে ফেলছেন। নাফিসের বড় দুই বোন মিতু ও মিম পাগলপ্রায়।

নাফিসদের বাড়ির একটু দূরে মারুফ হোসেন বাপ্পীর বাড়ি। বাপ্পীও প্রাথমিকে ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি পাওয়া ছাত্র। মা হাজেরা বেগম বাড়ির উঠোনে বসে বিলাপ করছেন। বাবা মো. বাবুল হাওলাদার বলেন, ‘আমার ছেলে শান্তশিষ্ট। কখনও কারও সঙ্গে জগড়া-বিবাদ করেনি। তুচ্ছ ঘটনার জন্য কিশোর গ্যাং আমার ছেলেকে কুপিয়ে মারছে। আমি আমার ছেলে হত্যার বিচার চাই।’

দুই স্কুলছাত্র হত্যায় জড়িতদের গ্রেপ্তার করতে জোর চেষ্টা চলছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। ঘটনার পর থেকে বাউফল থানা-পুলিশ ও গোয়েন্দা বিভাগের একাধিক দল অভিযান পরিচালনা করছে বলে জানায় পুলিশের একটি সূত্র। ঘটনার পর থেকে ঘটনাস্থলে অবস্থান করছে পুলিশের টহল দল। ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন পুলিশ সুপার, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার, সহকারী পুলিশ সুপার ও থানার ওসি। এ ছাড়া বিভিন্ন গেয়েন্দা সংস্থাও ঘটনাস্থল পরির্দশন করেছে।

পুলিশ সুপার মো. সাইদুল ইসলাম বলেন, এই ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের গ্রেপ্তার করতে পুলিশ ও গেয়েন্দা দলের সাঁড়াশি অভিযান চলছে। আসামিদের গ্রেপ্তারের পর সংবাদ সম্মেলন করে বিস্তারিত জানানো হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *