আমাদের বাউফলবগারাজনীতিসারাদেশ

হাতে গড়া মোতালেবে বিপাকে এমপি ফিরোজ

বাউফল আওয়ামী লীগে দ্বন্দ্ব
হাতে গড়া মোতালেবে বিপাকে এমপি ফিরোজ

প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণে আওয়ামী লীগের রাজনীতি * সংঘর্ষ ও হামলার ঘটনায় গ্রেফতার হয়নি কেউ

যুগান্তর: এক সময় ছিলেন একনিষ্ঠ শিষ্য। নেতার বদান্যতায় হয়েছিলেন ছাত্রলীগ-যুবলীগের সভাপতি। একই পন্থায় যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক পদে থাকার পর টানা তৃতীয়বারের মতো পালন করছেন দলের উপজেলা সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব।

সর্বশেষ নেতার ইচ্ছা ও সমর্থনে দলীয় মনোনয়নে উপজেলা চেয়ারম্যান হন। যার সহায়তায় এত অর্জন সেই নেতা এমপি আ স ম ফিরোজেরই এখন সবচেয়ে বড় প্রতিপক্ষ মোতালেব হাওলাদার। যার কারণে কর্মসূচি ঘোষণা করেও শেষ পর্যন্ত প্রশাসনের হস্তক্ষেপে তা আবার প্রত্যাহার করতে হয়েছে ফিরোজ অনুসারীদের।

৭ বারের এমপি আ স ম ফিরোজের রাজনৈতিক জীবনে যেটি ছিল প্রথম পিছু হটার ঘটনা। অথচ এক সময় এই মোতালেবকে নিজের প্রয়োজনে গড়েছিলেন ফিরোজ। পটুয়াখালী-২ নির্বাচনি এলাকার প্রবেশদ্বার হিসাবে পরিচিত বগা ফেরিঘাট এলাকায় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে তাকে গড়েছিলেন নিজের হাতে।

বাউফল উপজেলা নিয়ে গঠিত এই নির্বাচনি এলাকার সাধারণ মানুষের মতে, রাজনৈতিক জীবনের অনেক অর্জনের পর হয়তো সংসদ-সদস্য হওয়ার স্বপ্ন দেখছিলেন মোতালেব। কিন্তু গোল বাঁধে যখন ছেলে রায়হান সাকিবকে রাজনীতির মাঠে প্রতিষ্ঠিত করার মিশনে নামেন ফিরোজ। সর্বশেষ জাতীয় নির্বাচনে নিজের পাশাপাশি সাকিবকে দিয়েও দাখিল করান মনোনয়ন। ঋণখেলাপি জটিলতায় মনোনয়ন বাতিলের শঙ্কা থাকায় এমনটা করেন তিনি।

নিজের মনোনয়ন বাতিল হলে ছেলে সাকিব হবেন প্রার্থী এমনটাই ছিল আশা। সাকিবকে দিয়ে মনোনয়ন দাখিল করানোর ওই সময় থেকেই মানসিকভাবে এমপি ফিরোজের কাছ থেকে দূরে সরা শুরু মোতালেবের। পেছনে এ নিয়ে সমালোচনাও করতেন। দলের সর্বশেষ উপজেলা কমিটি গঠনের সময় আরও পরিষ্কার হয় এই দূরত্ব। নিজে সভাপতি হয়ে ছেলে সাকিবকে সিনিয়র সহসভাপতি করার উদ্যোগ নেন ফিরোজ। কেন্দ্রের হস্তক্ষেপে শেষ পর্যন্ত যদিও তা হয়নি।

স্থানীয় একাধিক নেতাকর্মীর মতে, এরপর থেকেই প্রকাশ্য হতে শুরু করে এমপি ফিরোজ ও মোতালেবের দ্বন্দ্ব। পালটাপালটি কর্মসূচি আর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনের ১৪৪ ধারা জারির মাধ্যমে অশান্ত হতে থাকে পরিবেশ। যার সর্বশেষ পরিণতি ১৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর জন্মবার্ষিকীর দিনের সংঘর্ষ। এমপি ফিরোজ ও মোতালেব পক্ষের পালটাপালটি কর্মসূচির জেরে ঘটে এ রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ। ফিরোজ গ্রুপের হামলায় গুরুতর আহত হন উপজেলা চেয়ারম্যান মোতালেব। এ ঘটনার পরপরই পালটে যায় বাউফলের প্রেক্ষাপট। দৃশ্যপটে এমপি ফিরোজের কঠিন প্রতিপক্ষ হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হন মোতালেব।

প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণে আওয়ামী লীগের রাজনীতি : কথা হচ্ছিল বাউফল-বগা সড়কের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী আনোয়ার মুন্সীর সঙ্গে। সরাসরি দল না করলেও মনে-প্রাণে আওয়ামী লীগের সমর্থক। ক্ষোভের সুরে তিনি বলেন, এখানে এখন অনেক নেতা। সবাই এমপি হতে চায়। অথচ পদ্মা সেতু নির্মাণসহ আওয়ামী লীগের যত অর্জন তার কোনো প্রচার নেই। এই যে পালটাপালটি কর্মসুচি নিয়ে সংঘর্ষ হলো, সেদিন ছিল জাতির পিতার জন্মদিন। ওইদিন বাউফলে যত মিছিল সমাবেশ হয়েছে তার কোনোটিতেই বঙ্গবন্ধুর নাম ছিল না। সবাই ব্যস্ত ছিল আত্মপ্রচারে। শহরজুড়ে সেদিন শুধু অমুক ভাই, তমুক ভাইর স্লোগান হয়।

উপজেলা আওয়ামী লীগের এক নেতা বলেন, পরিস্থিতি এমন যে আওয়ামী লীগের রাজনীতির নিয়ন্ত্রণ গেছে প্রশাসনের হাতে। ১৭ মার্চের ঘটনার প্রতিবাদে বিক্ষোভের ডাক দিল মোতালেব সমর্থকরা। পালটা শান্তি মিছিল ডাকল ফিরোজের লোকজন। পালটাপালটি এই আয়োজনে উত্তেজনা দেখা দিলে হস্তক্ষেপ করেন পটুয়াখালীর জেলা প্রশাসক। দুপক্ষকে ডেকে হুঁশিয়ারি দেন পালটাপালটি কর্মসূচি না দিতে। ফলাফল কর্মসূচি প্রত্যাহারে বাধ্য হয় ফিরোজ অনুসারীরা। বিষয়টা এই দাঁড়াল যে দ্বন্দ্ব নিরসনে ব্যর্থ হলেন সিনিয়র নেতারা। নিয়ন্ত্রণ চলে গেল প্রশাসনের হাতে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে জেলা প্রশাসক শরিফুল ইসলাম বলেন, দুপক্ষকে ডেকে বলে দিয়েছি পালটাপালটি কোনো কর্মসূচি হবে না। যারা প্রথম ঘোষণা করবে তাদেরটা হবে। অন্যদের ভিন্ন তারিখে কর্মসূচি করতে হবে। শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষায় এই উদ্যোগ নেওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না।

ফিরোজ-মোতালেব দুজনকেই দুষছেন কর্মী-সমর্থকরা : বাউফল উপজেলা ও পৌর আওয়ামী লীগের একাধিক নেতাকর্মী বলেন, দল নয় ব্যক্তিকেন্দ্রিক ক্ষমতার দ্বন্দ্বেই আজ এমন পরিস্থিতি। বগা এলাকায় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার টার্গেটে নিজের হাতে গড়া মোতালেব এখন ফিরোজের প্রতিপক্ষ। এই মোতালেবের বাবা মোচন হাওলাদার ছিলেন একজন সাধারণ কৃষক। রাজনীতিতে মেধার পরিচয় দেওয়া মোতালেব খুব সহজেই নজরে পড়েন এমপি ফিরোজের। এরপর আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি।

একাধিক হত্যা মামলার আসামি হওয়া থেকে শুরু করে হামলা, মারধর, দখলসহ হেন অপকর্ম নেই যা করার অভিযোগ নেই মোতালেবের বিরুদ্ধে। একের পর এক অপকর্ম করলেও তা নিয়ে কখনোই মুখ খোলেননি ফিরোজ। বরং রাজনৈতিক বিবেচনায় হত্যাসহ একাধিক মামলা প্রত্যাহারে পেছন থেকে সহযোগিতা করার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। শূন্য থেকে মোতালেবকে আজকের এই অবস্থানে নিয়ে আসার পেছনে এভাবে সমর্থন দেওয়ার কারণও ছিল।

স্থানীয় রাজনীতিতে নিজের একাধিপত্য ধরে রাখার জন্যই এটা করেছিলেন তিনি। শুধু মোতালেব-ই নয়, পুরো দলকেই এভাবে টানা ৪০ বছর ধরে কুক্ষিগত করে রেখেছেন এমপি ফিরোজ। এখন চাইছেন রাজতন্ত্রের মতো নিজের পর ছেলের হাতে ক্ষমতা দিতে। আজ বাউফলের যে পরিস্থিতি তার জন্যে সমান দোষে দোষী এই দুজন। অপরাধের প্রশ্রয় দিলে সেই অপরাধী যে নিজের বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়ায় তার জলজ্যান্ত প্রমাণ এই দুই নেতা।

এদিকে ওই সংঘর্ষের ৭ দিন পার হলেও এখনো কাউকে গ্রেফতার করা হয়নি। পুলিশ বাদী হয়ে আড়াইশজনের বিরুদ্ধে একটি মামলা করলেও হামলার ঘটনায় মামলা করেনি মোতালেব বা তার পরিবার।

এ বিষয়ে বাউফল থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আল মামুন বলেন, ভিডিও দেখে হামলাকারীদের চিহ্নিত করার কাজ চলছে। খুব শিগগিরই আমরা দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেব।

এ বিষয়ে এমপি ফিরোজ বলেন, বিএনপি-জামায়াতের লোকজন নিয়ে চলেন মোতালেব। টার্গেট বাউফলের শান্তি বিনষ্ট করা। যে লোক দেড় দু’বছর ধরে দলীয় কার্যালয় জনতা ভবনে আসে না সে যখন ওই ভবন টার্গেট করে পালটা কর্মসূচি দেয় তখন তো বোঝাই যায় যে তার উদ্দেশ্য ভালো নয়।

একক অধিপত্যের অভিযোগ বিষয়ে তিনি বলেন, কাউন্সিলে প্রার্থী হয়ে ভোটে জিতে যে কেউ এখানে আমার সভাপতি পদ কেড়ে নিতে পারে। কিন্তু কেউ নিচ্ছে না কেন? আমি এমপি বলে কি আমার ছেলে রাজনীতি করবে না? মোতালেবের ছেলেও তো বগা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ও যুবলীগ নেতা।

এ বিষয়ে হামলায় আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন মোতালেব হাওলাদারের বক্তব্য নেওয়া সম্ভব না হলেও হাসপাতাল থেকে দেওয়া এক ভিডিও বার্তায় বাউফলের বর্তমান পরিস্থিতির জন্য তিনি দায়ী করেছেন এমপি ফিরোজকে। প্রাণনাশের উদ্দেশ্যেই তার ওপর হামলা হয়েছে উল্লেখ করে এর জন্যও তাকেই দায়ী করেন। একইসঙ্গে তার ওপর হামলার বিচার চেয়েছেন বাউফলের সাধারণ মানুষের কাছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *