আমাদের বাউফল

সর্বহারা জবাব চায়: ইউএনও পিজুস চন্দ্র দে

রুশমি আক্তার তাহিরাঃ

ইলশেগুঁড়ি বৃষ্টি। নদীর বুকে ভেসে থাকা সার সার নৌকা। এর কোন একটি নৌকার ছৈ এর নিচে বসে জীবনে মোটামুটিভাবে সব পেয়ে যাওয়া আপনি উপভোগ করছেন প্রকৃতির অপার্থিব লীলা। আর আনমনে কষছেন জীবনের হিসাব। সামনে ধোঁয়া ওঠে গরম খিচুড়ির সাথে ডুবো তেলে সদ্য ভেজে তোলা প্রমান সাইজের ইলিশ মাছ।
ব্যাকগ্রাউন্ডে আইপডে ইন্দ্রনীল এর কন্ঠে বাজছেঃ
“মন মোর মেঘের সঙ্গী…
উড়ে চলে দিগ দিগন্তের পাণে,
নিঃসীম শূণ্যে.… ”
— আহ কি অসাধারণ বাঙ্গালি রোম্যান্টিক দৃশ্য! এইসব দৃশ্যগুলোই আমাদের ছেলেবেলার কল্পনার A Journey by Boat রচনার কাচামাল বা রসদ। কিন্তু এই রোম্যান্টিকতার বাইরেও যে বেশ রূঢ় একটা বাস্তব, কঠোর পৃথিবী আছে, তার খোঁজ ক’জন রাখে। সেখানে যে পরীক্ষায় A Journey by Boat নয়, রচনা হিসাবে নিত্য লিখতে হয়ঃ A Life in a Boat;

মানিকবাবু অনেক ক্ষোভে, দুঃখে ঈশ্বরকে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন ওই ভদ্রপল্লীতে। আর আজ আমরা ক’জন তাঁকেই খুঁজতে গিয়েছিলাম নদীতে ভেসে বেড়ানো ঠিকানাবিহীন মান্তাপল্লীতে। এ এক অদ্ভুত জীবনঃ How many things we can do without;

বাউফলের কালাইয়া ইউনিয়নের প্রান্তে তেতুলিয়ার কোল ঘেষে মান্তাদের কলোনি। নদীর বুকে ভেসে বেড়ানো এ কলোনি ঢেউয়ের তালে তালে নেচে বেড়ায়। মান্তারা মূলতঃ মৎস্যজীবি। আলো ফুটতেই নৌকা নিয়ে ভেসে পড়েন নদীর বুকে। দিনভর মাছ তুলে সন্ধ্যা হাটেই করে ফেলেন সুখের সওদা। এভাবেই দিন গড়িয়ে সন্ধ্যা, অতঃপর রাত; রাত পেরিয়ে বছর; আর বছর শেষে ঈদ। আর এমনি করেই জীবনের নিয়মে কেটে যায় জীবন।

দু’দিন পরেই ঈদ। ঘরে ঘরে আনন্দ। সরকারের তরফ থেকে সেই আনন্দ আর খুশির সামান্য অংশ মান্তাদের মাঝে পৌঁছে দিতেই সারাদিন নানাবিধ কাজের শেষে উপজেলার কিছু উৎসাহী কর্মকর্তাদের নিয়ে সদলবলে হাজির হই মান্তাপল্লীতে। প্রথমেই একটি নৌকায় উঠে পড়ি। সচক্ষে পরখ করি তাদের জীবন-যাপন পদ্ধতি। একান্তে আলাপ হয় মোহাম্মদ আলী ও তার পরিবারের সাথে। পাতিল-ভরা ভাত আর আলু দিয়ে রান্না করা ইলিশের ঘ্রাণে চাপা পড়ে যায় তাঁর পনের বছরের বিবাহিত জীবনে নিঃসন্তান থাকার কষ্ট।

স্পটে থাকা প্রতিটি নৌকার একজন করে প্রতিনিধি সারিবদ্ধভাবে দাড় করিয়ে প্রত্যেকের হাতে তুলে দেয়া হয় চাল, ডাল, তেল, চিনি, শুকনা খাবারসহ উপজেলা প্রশাসনের যৎসামান্য উপহার।
এরমধ্যেই কানে কানে কে যেন বলে যায়ঃ
স্যার, দু’একজন ডাবল নিয়েছে।
মনে মনে ভাবি, আচ্ছা নিক না।
প্রয়োজন যার, সেই জানে – কতটুকু লাগে, কেন লাগে!

ফেরার পালা। এসময় ভীড়ের মধ্যে কেউ একজন যখন একটু ঠান্ডা খেয়ে যেতে বলে, অবাক লাগে!
তথাপি সৌজন্য!!
ফিরে যাই আর মনে মনে গাইঃ

এক দেবতা রাজপ্রাসাদে
শোষননীতির প্রসাদ খায়,
অন্যজনে ঠাকুরঘরে
নিঃস্বজনের দুঃখ সয়।
দুঃখ-সুখের সমানভাগে —
সেই ভগবান আসবে কবে?
–সর্বহারা জবাব চায়।।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *