অপরাধআন্তর্জাতিক

‘মিয়ানমারকে আইসিসির মুখোমুখি করুক জাতিসংঘ’

রাখাইনে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর মিয়ানমারের চালানো নৃসংশতা এবং অমানবিক কাজ তদন্তের বিষয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) রায়ের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে একাধিক বৈশ্বিক সংস্থা এবং বিশ্বনেতারা। সকলেই রোহিঙ্গা নৃশংসতার সঙ্গে জড়িত মিয়ানমারের সেনাসহ সংশ্লিষ্টদের বিচারের কাঠগড়ায় তোলার দাবি জানিয়েছে।

পাশাপাশি দাবি উঠেছে যে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ মিয়ানমারকে আইসিসিতে পাঠাক, যাতে এই নৃশংসতার পূর্ণ তদন্ত করে অপরাধীদের শাস্তির আওতায় আনা যায়।

রোহিঙ্গা নৃসংশতার তদন্ত করতে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের উচিত মিয়ানমারকে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে (আইসিসি) পাঠানো। সুইজারল্যান্ড এবং যুক্তরাষ্ট্রে নিবন্ধিত দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মানবাধিকার বিষয়ক অলাভজনক সংস্থা ফরটিফাই রাইটস শুক্রবার (৮ সেপ্টেম্বর) এক বিবৃতিতে এ দাবি জানিয়েছে।

ফরটিফাই রাইটস এর বিবৃতিতে সংস্থাটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ম্যাথু স্মিথ বলেন, ‘রোহিঙ্গা ইস্যুতে আইসিসি’র রায় খুবই গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু বিষয়টি একেবারেই প্রাথমিক অবস্থায় রয়েছে। এ রায় রোহিঙ্গা ইস্যুতে কঠোর পদক্ষেপ নিতে আন্তর্জাতিক অঙ্গণকে উৎসাহ যোগাবে। কিন্তু জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ যদি মিয়ানমারকে আইসিসিতে যেতে বাধ্য করতে পারে তবে এ নৃশংসতার পূর্ণ চিত্র তদন্ত করতে আইসিসি’র জন্য সহজ হবে।’

আইসিসির আদেশের মধ্য দিয়ে রোহিঙ্গা নির্যাতনের বিরুদ্ধে বিচারের পথ সুগম হল, উল্লেখ করে আরেকটি বৈশ্বিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল শুক্রবার (৮ সেপ্টেম্বর) এক বিবৃতিতে বলেছে, ‘রোহিঙ্গা নৃশংসতার ইস্যুতে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে তদন্ত করার বিষয়ে আইসিসি (আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে) যে রায় দিয়েছে তা অভূতপূর্ব। রোহিঙ্গাদের কারা বাড়ি ছাড়া করেছে, কারা রাখাইনের ঘর-বাড়ি পুড়িয়েছে এবং মানবাধিকার লঙ্ঘন করেছে তা আইসিসি তদন্ত করলেই পরিষ্কার চিত্র পাওয়া যাবে।’

সুইডেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মর্গট ওয়ালসট্রম শুক্রবার (৮ সেপ্টেম্বর) এক বার্তায় বলেন, ‘নির্যাতনের শিকার হয়ে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে পালিয়ে এসে জীবন বাঁচিয়েছে। রাখাইনের মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়টি তদন্ত করার জন্য আইসিসি যে রায় দিয়েছে তা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। প্রকৃত অপরাধীদের অবশ্যই শাস্তি পেতে হবে।’

মালয়েশিয়ার সংসদ সদস্য চালর্স শান্তিয়াগো এক বার্তায় বলেন, ‘আইসিসি’র রায় রাখাইনে ঘটে যাওয়া অমানবিক কাজের বিচার নিশ্চিত করবে।’

এদিকে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর মানবতাবিরোধী কর্মকাণ্ড চালানোর অপরাধে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে বিচার করতে পারবে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি)। নেদারল্যান্ডসের দ্য হেগে অবস্থিত আইসিসি বৃহস্পতিবার (৬ সেপ্টেম্বর) এক আদেশে এ তথ্য জানিয়েছে।

বাংলাদেশ আইসিসির সদস্য রাষ্ট্র কিন্তু মিয়ানমার সদস্য নয়। তাই রোহিঙ্গা ইস্যুতে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অপরাধে আইসিসি মিয়ানমারের বিচার করতে পারবে কি না সেই বিষয়ে বৃহস্পতিবার (৬ সেপ্টেম্বর) আইসিসি’র প্রি ট্রায়াল চেম্বারে এক শুনানি অনুষ্ঠিত হয়।

ওই শুনানিতে আইসিসির বিচারক পিটার কোভাকস, বিচারক মার্ক পেরিন ডি ব্রিচাম্বো এবং বিচারক রেনে এডিলেড সোপিয়ে আলাপিনি-গানসু রায় দেন যে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে আইসিসি বিচার করতে পারবে।

মিয়ানমারে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর যে মানবতাবিরোধী অপরাধ ঘটেছে, তা তদন্তের জন্য আইসিসি’র বিচারকদের অনুমতি চেয়ে গত ৯ এপ্রিল আবেদন করেন ওই আদালতেরই ফাতোহ বেনসুডা নামের একজন আইনজীবী (চিফ প্রসিকিউটর)। যার পরিপ্রেক্ষিতে বৃহস্পতিবার (৬ সেপ্টেম্বর) আইসিসির প্রি ট্রায়াল চেম্বারের বিচারকরা এ আদেশ দেন।

এর আগে ফাতোহ বেনসুডার আবেদনের প্রেক্ষিতে আইসিসির প্রি-ট্রায়াল বিভাগের প্রেসিডেন্ট গত ১১ এপ্রিল আবেদনটি শুনানির জন্য সংস্থাটির চেম্বার বিভাগে পাঠান।  পাশাপাশি তিনি এই বিষয়ে বাংলাদেশ সরকার এবং সুশীল সমাজের মতামত জানতে চাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।

মিয়ানমারের জান্তা বাহিনীর নির্যাতন সইতে না পেরে গত বছরের আগস্ট থেকে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ঢল নামে বাংলাদেশ সীমান্তে। জীবন বাঁচাতে গত বছরের আগস্ট থেকে সাড়ে ৭ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা পালিয়ে এসে কক্সবাজারের একাধিক শিবিরে আশ্রয় নিয়েছে।

একই কারণে গত বছরের আগস্ট এর আগে থেকে আরো ৪ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী বাংলাদেশের আশ্রয় শিবিরে আশ্রয় নিচ্ছিল। সব মিলিয়ে বর্তমানে সাড়ে ১১ লাখেরও বেশি মিয়ানমারের নাগরিক রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী জীবন বাঁচাতে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *