আন্তর্জাতিক

রোহিঙ্গা নির্যাতন: কানাডার সম্মানসূচক নাগরিকত্ব হারালেন সু চি

রাখাইনে রোহিঙ্গা মুসলমানদের বিরুদ্ধে সেনাবাহিনীর পরিকল্পিত নৃশংসতা ঠেকাতে ব্যর্থ হওয়ায় কানাডার সম্মানসূচক নাগরিকত্ব হারালেন মিয়ানমারের স্টেট কাউন্সিলর অং সান সু চি। এই সম্মাননা প্রত্যাহারের ওপর কানাডার পার্লামেন্টে ভোটাভুটির পর গতকাল (মঙ্গলবার) সরকারিভাবে এই ঘোষণা দেয়া হয়েছে।

সু চি’র নাগরিকত্ব প্রত্যাহার করে নিলেও নেলসন ম্যান্ডেলা, দালাই লামা ও মালালা ইউসুফজাইসহ আরও পাঁচ ব্যক্তির সম্মানসূচক নাগরিকত্ব বহাল থাকার কথা জানিয়েছে কানাডা সরকার।

এর আগে, গত সপ্তাহে দেশটির পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ হাউজ অব কমনসে প্রস্তাবটি সর্বসম্মতিক্রমে পাস হয়। কানাডার বিরোধী দল ব্লক কুইবেকয়েজ  প্রথম এ সংক্রান্ত প্রস্তাব উত্থাপন করলে তা দেশটির সংসদের নিম্নকক্ষে সবার সমর্থন লাভ করে।

কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডোর সঙ্গে অং সান সু চি (ফাইল ফটো)

২০০৭ সালে কানাডার হাউজ অব কমন্স সু চিকে সম্মানসূচক এই নাগরিকত্ব দেয়। কিন্তু গত মাসের শুরুর দিকে কানাডার আইনপ্রণেতারা মিয়ানমারের রাখাইনে সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা মুসলমানদের বিরুদ্ধে সেনাবাহিনীর নির্মম হত্যা-নির্যাতনকে সর্বসম্মতভাবে ‘গণহত্যা’ হিসেবে ঘোষণা করেছেন। রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে অপরাধকে গণহত্যা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে তারা একটি প্রস্তাবও পাস করেছেন। এর মধ্যদিয়ে মিয়ানমারে জাতিসংঘের ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং মিশনের তথ্য-উপাত্তকে অনুমোদন দেয় হাউস অব কমনস।

গত মাসে প্রকাশিত জাতিসংঘের ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়, মিয়ানমারের সেনাবাহিনী গণহত্যার অভিপ্রায় থেকেই রাখাইনের অভিযানে রোহিঙ্গা মুসলমানদের নির্বিচারে হত্যা, ধর্ষণের মত ঘটনা ঘটিয়েছে। আইন প্রয়োগের নামে ভয়ঙ্কর ওই অপরাধ সংঘটনের জন্য মিয়ানমারের সেনাপ্রধান এবং জ্যেষ্ঠ পাঁচ জেনারেলকে বিচারের মুখোমুখি করারও সুপারিশ করেছে ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশন।

নাফ নদীর পার হয়ে বাংলাদেশে আসতে গিয়ে নৌকাডুবিতে প্রাণ হারায় বহু রোহিঙ্গা শিশু

সেখানে বলা হয়েছে, মিয়ানমারের নোবেলজয়ী নেত্রী অং সান সু চির বেসামরিক সরকার বিদ্বেষমূলক প্রচারকে উসকে দিয়েছে, গুরুত্বপূর্ণ আলামত ধ্বংস করেছে এবং সেনাবাহিনীর মানবতাবিরোধী অপরাধ ও যুদ্ধাপরাধ থেকে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছে। আর এর মধ্যে দিয়ে মিয়ানমার সরকারও নৃশংসতায় ভূমিকা রেখেছে।

ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশন মনে করে, নোবেল শান্তি পুরস্কার পাওয়া সু চি বেসামরিক নাগরিকদের রক্ষায় তার নৈতিক কর্তৃত্ব ব্যবহারে ব্যর্থ হয়েছেন।

এ বিষয়ে নোবেল ফাউন্ডেশনের প্রধান লারস হেইকেনস্টেন বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বলেছেন, “মিয়ানমারে সু চি যা করছেন তা যে বেশ প্রশ্নবিদ্ধ, তা আমরা দেখছি। আমরা মানবাধিকারের পক্ষে, এটা আমাদের অন্যতম প্রধান মূল্যবোধ। অবশ্যই বিস্তৃত অর্থে তিনি এর (রাখাইনে দমনপীড়ন) জন্য দায়ী, যা খুবই দুঃখজনক।”

অং সান সু চির ভূমিকা কিছু ক্ষেত্রে ‘দুঃখজনক’ হলেও তার নোবেল শান্তি পুরস্কার প্রত্যাহার করা হবে না বলেও জানান তিনি।

২০১২ সালে এক বিশেষ অনুষ্ঠানে সু চি তার নোবেল বক্তৃতা দেন

সামরিক শাসনে থাকা মিয়ানমারে গণতন্ত্রের দাবিতে অহিংস আন্দোলনের জন্য ১৯৯১ সালে নোবেল শান্তি পুরস্কার পান সু চি। মিয়ানমার বেসামরিক সরকার ব্যবস্থায় ফিরলে ২০১৫ সালে নির্বাচনে জিতে সু চি মিয়ানমারের স্টেট কাউন্সিলর হন। মিয়ানমারের বেসামরিক প্রশাসনের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ এখন সু চিরই হাতে। তবে সাংবিধানিকভাবে সেনাবাহিনী এখনও বিপুল ক্ষমতাধর।

গত বছরের ২৫ আগস্ট রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর নৃশংস অভিযানের পর প্রাণভয়ে অন্তত ৭ লাখ রোহিঙ্গা সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে এসে আশ্রয় নেয়। প্রত্যাবাসন চুক্তি সত্ত্বেও নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার ব্যাপারে এখনও তাদের ভীতি রয়েছে। তাদের অনেকেই বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, যৌন নির্যাতন এবং অগ্নিসংযোগের শিকার হওয়ার লোমহর্ষক বর্ণনা দিয়েছেন।#

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *