বাংলাদেশ

৭২ বছরের পুরোটাই যার দেশমাতৃকার তরে

প্রথম হাঁটতে শেখার দিনে তার দিকে যে আঙুলটি এগিয়ে দেওয়া হয়েছিলো সেটি তার পিতার বটে, তবে একই সাথে তা ছিলো জাতির পিতার। যিনি ছিলেন এই স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি। প্রথমে সেই বাড়িয়ে দেওয়া হাত ধরে, পরে জাতির জনকের দেখিয়ে দেওয়া পথ ধরে তিনি হেঁটেছেন। আজও হাঁটছেন। হাঁটতে হাঁটতে পার করে দিয়েছেন ৭২টি বছর। শুক্রবার ২৮ সেপ্টেম্বর জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জ্যেষ্ঠ কন্যা শেখ হাসিনার জন্মদিন। দেশ মাতৃকার জন্য তিনি ন্যস্ত করেছেন এই বাহাত্তরটি বছরের সবটুকু। শুভ জন্মদিন শেখ হাসিনা, এমপি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার।

এই বাহাত্তর বছরের মধ্যে অর্ধেকের বেশি সময় ধরে নৌকা নামের একটি প্রতীকের হাল ধরে আছেন। সাথে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের। জীবনের প্রায় সিকিভাগ পার করে দিয়েছেন সরকারপ্রধান হিসেবে দেশের হাল ধরে। এখন জীবনের একটাই প্রত্যয়- জাতির জনকের স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়া। সে প্রত্যয় নিয়েই এগিয়ে চলছেন বঙ্গবন্ধু কন্যা আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

শেখ হাসিনার ৭২তম জন্মোৎসবের দিনটি বিভিন্ন কর্মসূচিতে তার দীর্ঘায়ু ও সুস্থ জীবন কামনায় পালন করবে আওয়ামী লীগ। গত কয়েক বছরের মতো এবারও জন্মদিনে দেশের বাইরে রয়েছেন শেখ হাসিনা। জাতিসংঘ সাধারণ অধিবেশনে যোগ দিতে যুক্তরাষ্ট্রে গেছেন তিনি।

পূর্ব নির্ধারিত কর্মসূচি অনুযায়ী ২৮ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়ায় ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়ের বাসায় পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে জন্মদিন কাটিয়ে ২৯ সেপ্টেম্বর লন্ডনের উদ্দেশ্যে নিউইয়র্ক ছাড়ার কথা রয়েছে শেখ হাসিনার।

এদিকে বৃহস্পতিবার থেকেই শুরু হয়ে গেছে শেখ হাসিনার জন্মদিন উপলক্ষে নানা আয়োজন। রাজধানীর জাতীয় জাদুঘরের প্রধান মিলনায়তনে সতীর্থ-স্বজন আয়োজিত বইয়ের মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠান হয়ে গেলো। এতে শেখ হাসিনার শিক্ষক জাতীয় অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম ছিলেন অন্যতম বক্তা। তিনি বলেন, শেখ হাসিনা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের ছাত্রী ছিলেন এবং আমি সেই বিভাগের শিক্ষক ছিলাম। সুতরাং ১৯৬৭ সাল থেকে আমি তাকে দেখে আসছি। আমি তাকে ছাত্রী হিসেবে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত পেয়েছি। পরবর্তীকালে তিনি যখন নির্বাসন থেকে প্রত্যাবর্তন করেন তখন তাকে রাজনীতিবিদ হিসেবে দেখেছি। আরও পরবর্তীকালে তাকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেখার সুযোগ বা সৌভাগ্য আমার হয়েছে। তার এই জীবনে দেশমাতৃকার প্রতি যেভাবে তিনি কর্তব্য পালন করেছেন, আমার একটা কথাই শুধু বলতে ইচ্ছে করছে, তিনি উপযুক্ত পিতার উপযুক্ত কন্যা। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের যোগ্য কন্যা শেখ হাসিনা।’

‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ গড়ে তোলার আমৃত্যু যে কাজ সেইটাই সমাপন করতে কাজ করছেন শেখ হাসিনা। আসুন, আমরা সবাই তার দীর্ঘজীবন সুস্থজীবন কামনা করি এবং বাংলাদেশের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ কামনা করি,’ বলেন অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম।

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং বেগম ফজিলাতুন্নেসা মুজিবের প্রথম সন্তান শেখ হাসিনার জন্ম ১৯৪৭ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর মধুমতি নদীবিধৌত গোপালগঞ্জ জেলার টুঙ্গীপাড়ায়। ১৯৬৮ সালে বিজ্ঞানী এম ওয়াজেদ মিয়ার সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। তিনি এক ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় এবং এক মেয়ের সায়মা ওয়াজেদ পুতুলের মা।

শেখ হাসিনার শিক্ষাজীবন শুরু হয় টুঙ্গীপাড়ার এক পাঠশালায়। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে শেখ মুজিবুর রহমান প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য (এমপিএ) নির্বাচিত হওয়ার পর তার পরিবারকে ঢাকায় নিয়ে আসেন। পুরান ঢাকার মোগলটুলির রজনী বোস লেনে শুরু হয় তাদের বসবাস। পরে যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিসভার সদস্য হন শেখ মুজিবুর রহমান। পিতার মন্ত্রীত্বে এরপর তাদের ঠিকানা হয় ৩ নম্বর মিন্টো রোডের সরকারি বাসভবন। ১৯৫৬ সাল শেখ হাসিনা ভর্তি হন টিকাটুলির নারীশিক্ষা মন্দির বালিকা বিদ্যালয়ে। ১৯৬১ সালের ১ অক্টোবর ধানমণ্ডির ৩২ নম্বর রোডের বাড়িতে বসবাস শুরু করেন বঙ্গবন্ধু। এ সময় ১৯৬৫ সালে আজিমপুর বালিকা বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন শেখ হাসিনা। ১৯৬৭ সালে উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করেন ঢাকার বকশী বাজারের পূর্বতন ইন্টারমিডিয়েট গভর্নমেন্ট গার্লস কলেজ (বর্তমান বদরুন্নেসা সরকারি মহিলা মহাবিদ্যালয়) থেকে। কলেজে অধ্যয়নকালে তিনি কলেজ ছাত্রী সংসদের সহ-সভানেত্রী (ভিপি) পদে নির্বাচিত হন। সে বছরই ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। রাজনৈতিক পরিবারে জন্মগ্রহণ করায় ছোটবেলা থেকেই তার ছিল রাজনীতির অঙ্গনে পদচারণা।

১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট কালরাতে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবারে নিহত হন। এ সময় বিদেশে থাকায় বেঁচে যান তার দুই কন্যা শেখ হাসিনা এবং শেখ রেহানা। তৎকালীন সরকারের বিরোধিতার কারণে এরপর কয়েক বছর দেশে ফিরতে পারেননি শেখ হাসিনা। বিদেশে নির্বাসিত থাকাকালে ১৯৮১ সালের ফেব্রুয়ারিতে তার অনুপস্থিতিতেই আওয়ামী লীগের সম্মেলনে তাকে দলীয় প্রধান নির্বাচিত করা হয়। ওই বছরের ১৭ মে দেশে ফিরে আওয়ামী লীগের দায়িত্ব নেন। সেই থেকে আজ অবধি শত চরাই-উৎরাই, বাধা-বিপত্তি পেরিয়ে দলীয় সভাপতির দায়িত্বভার বহন করে চলছেন তিনি।

ইতোমধ্যে তার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ তিন মেয়াদে সরকার গঠন করেছে। সামনে আগামী জাতীয় নির্বাচনে টানা তৃতীয় মেয়াদে সরকার গঠন করলে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার রাজনৈতিক অঙ্গনের নতুন ইতিহাস রচনার হাতছানি শেখ হাসিনার সামনে। তার নেতৃত্বে দীর্ঘ ২১ বছর পর ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় আসে আওয়ামী লীগ। এরপর ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরের নির্বাচনে বিপুল আসনে বিজয়ী হয়ে ২০০৯ সালের ৬ জানুয়ারি আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে মহাজোট সরকার গঠিত হয়। পরবর্তীতে টানা দ্বিতীয় মেয়াদে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি নির্বাচনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করে আওয়ামী লীগ।

৭২ বছরে জীবনের অর্ধেকের বেশী সময় ধরে আওয়ামী লীগের মতো বিশাল সংগঠনের হাল ধরে জীবনের এ পর্যায়ে সাগর সমান অর্জনে সমৃদ্ধ তার কর্মময় জীবন। তার নেতৃত্বের কল্যাণে এক সময়কার দারিদ্র্য-দুর্ভিক্ষে জর্জরিত বাংলাদেশ এখন অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার লড়াই পেরিয়ে বিশ্বজয়ের নবতর অভিযাত্রায় এগিয়ে চলছে। বিশ্বসভায় আত্মমর্যাদাশীল জাতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তার নেতৃত্বে অমিত সম্ভাবনার দেশ অপ্রতিরোধ্য গতিতে এগিয়ে চলছে। এর মধ্যে তাকে পড়তে হয়েছে নানা সঙ্কটে। জীবনের উপর হুমকি এসেছে। একুশে আগস্ট গ্রেনেড হামলার মতো ভয়াবহ হামলা চালিয়ে তাকে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছে। যাত্রাপথে বোমা পুঁতে, গাড়ির বহরে গুলি চালিয়ে হত্যার চেষ্টা করেছে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষসহ বিভিন্ন অশুভ শক্তি। তবে মহান করুণাময়ের ইচ্ছায় মৃত্যুর মুখ থেকে বেঁচে এসেছেন বার বার। যা তাকে দেশকে সেবা করে যাওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে।

এবারের জন্ম তিথিতে শেখ হাসিনা নিজে বিদেশের মাটিতে অবস্থান করলেও ৭২তম জন্মদিনটি উৎসব মুখর পরিবেশে উদযাপন করবে আওয়ামী লীগ। কেন্দ্রীয় কর্মসূচির অংশ হিসেবে ২৮ সেপ্টেম্বর বিকেল সাড়ে তিনটায় আওয়ামী লীগের উদ্যোগে কৃষিবিদ ইনস্টিটিউট মিলনায়তনে আলোচনা সভা রয়েছে। এবার আলোচনার বিষয়বস্তু হলো ‘নবীনদের দৃষ্টিতে শেখ হাসিনা’। এছাড়াও বাদ জুম্মা জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমে মিলাদ ও দোয়া মাহফিল, সকাল ১০টায় আন্তর্জাতিক বৌদ্ধ বিহার (মেরুল বাড্ডা) ও সকাল ৯ টায় খ্রিস্টান এসোসিয়েশন বাংলাদেশ (সিএবি) ওয়াই.এম.সি. এ চ্যাপেল, ২৯ সেনপাড়া, পর্বতা, মিরপুর-১০ এবং সকাল ১১টায় ঢাকেশ্বরী মন্দিরে বিশেষ প্রার্থনা অনুষ্ঠিত হবে। এছাড়াও সারাদেশে সহযোগী সংগঠনের উদ্যোগে আনন্দ র‌্যালি ও শোভাযাত্রা কর্মসূচি পালন করা হবে। দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের আওয়ামী লীগ সভাপতির ৭২তম জন্মদিনটি সংগঠনের নেতাকর্মীদের উৎসব মুখর পরিবেশে পালন করার অনুরোধ জানিয়েছেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *