খেলাধুলা

মোস্তাফিজের সেই ‘আগুন ঝরানো’ বোলিং যে খুব দরকার

তামিম-সাকিব নেই। আজ (শুক্রবার) এশিয়া কাপের ফাইনালে ভারতের বিপক্ষে মাশরাফির বাংলাদেশের আশা ভরসার কেন্দ্রবিন্দু মুশফিকুর রহিম। শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে আসরের প্রথম ম্যাচে ১৪৪ রানের দুর্দান্ত ম্যাচ জেতানো ইনিংস উপহার দিয়ে ম্যাচ সেরা মুশফিক ঠিক ৪৮ ঘন্টা আগে পাকিস্তানের সাথে অঘোষিত সেমির যুদ্ধে ৯৯ রানের সংগ্রামী ইনিংস খেলে দলকে জয়ের পথ দেখিয়েছেন ।

‘পঞ্চ পান্ডবের’ আরেক সদস্য মাহমুদউল্লাহ রিয়াদের দিকেও তাকিয়ে বাংলাদেশ। এর পাশাপাশি মোহাম্মদ মিঠুন এবং অফস্পিনার মেহেদি হাসান মিরাজও অধিনায়ক মাশরাফির আস্থা এবং নির্ভরতা।

আজ ফাইনালে ভারতের বিপক্ষে এই কাটার মাষ্টারের বোলিংয়ের ওপর নির্ভর করবে বাংলাদেশের ভাগ্য। মোস্তাফিজ ভাল বল করে ভারতীয় ব্যাটসম্যানদের স্বচ্ছন্দ, সাবলীল উইলোবাজির পথে বাঁধার পাশাপাশি রোহিত শর্মা, শিখর ধাওয়ান, লোকেশ রাহুলদের ইচ্ছেমত শটস খেলা থেকে বিরত রাখতে পারলে বাংলাদেশের জয়ের সম্ভাবনা থাকবে যথেষ্ঠ। আর মোস্তাফিজ বল হাতে আগুন ঝড়াতে না পারলে বাংলাদেশের জেতা কঠিন হবে। তাই আজকের ফাইনালে কাটার মাষ্টারও অনেক বড় নির্ভরতা। আশার প্রদীপ।

তার ওয়ানডে ক্যারিয়ারই শুরু ভারতের বিপক্ষে ৫ উইকেট দিয়ে। খুব বেশী দিন আগের কথা নয়। ২০১৫ সালের ১৮ জুন শেরে বাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে রোহিত শর্মা, আজিঙ্কা রাহানে, সুরেশ রায়না, রবীন্দ্র জাদেজা ও রবিচন্দ্রন অশ্বিনের উইকেট নিয়ে বাংলাদেশের ৭৯ রানের বড় জয়ের স্বর্থক রুপকার-নায়ক। ৫০ রানে ভারতের ইনিংসের অর্ধেকটা পকেটে পুরে ম্যাচ সেরা মোস্তাফিজুর রহমান।

৪৮ ঘন্টা পর সেই শেরে বাংলায় পরের ম্যাচে নিজেকে আরও ছাড়িয়ে যাওয়া। এবার ৪৩ রানে ৬ উইকেট শিকার। তার বিষাক্ত কাটার, স্লোয়ার ও বিধ্বংসী সুইংয়ে ক্ষত-বিক্ষত ভারতীয় ব্যাটিং। রোহিত শর্মা, মহেন্দ্র সিং ধোনি, সুরেশ রায়না, রবীন্দ্র জাদেজা, অক্ষর প্যাটেল ও রবিচন্দ্রন অশ্বিনকে সাজঘরে ফেরত পাঠিয়ে ভারতীয় ইনিংসকে নিয়ন্ত্রনে রাখার কাজটি অসামান্য দক্ষতায় করে দেখান বাঁহাতি পেসার মোস্তাফিজুর রহমান।

মোদ্দা কথা, তিন বছর আগে রাজধানী ঢাকায় ভারতের সাথে বাংলাদেশের এখন পর্যন্ত একমাত্র ওয়ানডে নিরিজ বিজয়ের মুল রুপকার এই মোস্তাফিজ। তার বোলিং নৈপুন্য আর বোলিং তোগ সামলাতে না পেরেই যথাক্রমে ৭৯ আর ৬ উইকেটে (ডিএল ম্যাথডে) হার মানতে বাধ্য হয় ধোনির ভারত।

কিন্তু হায়! ভারতের বিশ্ব মানের ব্যাটিং শক্তিকে ক্যারিয়ারের একদম শুরুতে ‘ঘোল পানি খাওয়ানো’ আর চরম নাস্তানাবুদ করা সেই স্লোয়ার স্পেশালিষ্ট এবং কাটার মাষ্টার পরের ম্যাচে আর দল জেতানো বোলিং করতে না পারলেও ২ উইকেট শিকারী। মানে তিন ম্যাচের প্রথম সিরিজে ১৩ উইকেট। রীতিমত স্বপ্নীল সূচনা। এমন উদ্ভাসিত সূচনার পর হঠাৎ ফিঁকে মোস্তাফিজ।

ভারতের বিপক্ষে সর্বশেষ দুই ম্যাচে আর উইকেটই পাননি। একজন বোলার ওয়ানডেতে প্রতিদিন চার-পাঁচ উইকেট পাবেন- এমন নয়। তবে মোস্তাফিজের শুরুর সাথে পরের দুই ম্যাচের পার্থক্য যে বিস্তর। গত বছর ১৫ জুন বার্মিংহ্যামের এজবাষ্টনে আইসিসি চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির সেমিফাইনাল আর এবারের এশিয়া কাপে প্রথম পর্বের ম্যাচ- কোনোটাতে ১০ ওভারের কোটাই পুরণ করা সম্ভব হয়নি। ভারতীয় ব্যাটসম্যানদের ব্যাটিং তোড়ে খর কুটেরর মত উড়ে গেছে কাটার মাষ্টারের ‘জারিজুরি’।

বার্মিংহামে ৬ ওভারে (ওভার পিছু ৮.৮৩ রান) দিয়েছেন ৫৩। আর এবার ২১ সেপ্টেম্বর দুবাইতে তার ৭ ওভারে ৪০ রান তুলে নিয়েছেন ভারতীয় ব্যাটসম্যানরা।

পরিসংখ্যান জানান দিচ্ছে ক্যারিয়ারের একদম শুরুতে ভারতীয় ব্যাটসম্যানদের পথে কাঁটা হয়ে দেখা দিয়ে বাংলাদেশকে পর পর দুই ম্যাচে জয় উপহার দিয়েছিলেন মোস্তাফিজ। কিন্তু সময় গড়ানোর সাথে সাথে ভারতের সাথে তার সাফল্যর হার কমেছে অনেকটাই। বোঝাই যায়, তার স্লোয়ার-কাটারের মিশেল এবং বুদ্ধিদীপ্ত বোলিং নিয়ে ভারতীয় ব্যাটসম্যানরা অনেক বেশী হোমওয়ার্ক করেছেন। তাই ভারতের সাথে তার কার্যকরিতাও কমেছে। অবশ্য পাশাপাশি ফিটনেস সমস্যাও ভুগিয়েছে মোস্তাফিজকে। মাঝে প্রায়ই ইনজুরির পর রিহ্যাব করেই খেলতে নেমেছেন। বেশীর ভাগ সময় নিজের চেনা ছন্দ ও গতিতে বল করতে পারেননি মোস্তাফিজ।

তবে ওয়েষ্ট ইন্ডিজ সফর থেকেই যেন নিজেকে আবার ধীরে ধীরে ফিরে পেয়েছেন এ বাঁহাতি পেসার। এবার এশিয়া কাপে বেশ বোলিং করেছেন। ভারতের সাথে রবিন লিগের ম্যাচটিতেই কেবল উইকেট পাননি। এ ছাড়া আফগানিস্তানের সাথে গ্রুপ পর্বের প্রথম খেলায় বিশ্রামে ছিলেন। বাকি তিন খেলায় (২/২০, ২/৪৪ ও ৪/৪৩) ৮ উইকেট দখল করে দলের এক নম্বর বোলার হিসেবে নিজেকে মেলে ধরেছেন মোস্তাফিজ। এর মধ্যে মুশফিকুর রহিম, মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ আর মোহাম্মদ মিঠুনরা প্রানপণ লড়ে একটা সম্মানজনক পুজি গড়ে দিলেও আফগানিস্তানের সাথে ফিরতি লড়াই আর পাকিস্তানের সাথে অঘোষিত সেমির যুদ্ধে বাংলাদেশের জয়ের সত্যিকার নায়ক ও স্থপতি হলেন কাটার মাষ্টার। তার দুর্দান্ত ও বিধ্বংসী বোলিংয়ের মুখেই আসলে হার মেনেছে আফগান ও পাকিস্তানীরা।

এর মধ্যে আফগানিস্তানের সাথে ম্যাচে মোস্তাফিজের মাপা এবং বুদ্ধিদীপ্ত বোলিংয়েই হয়েছে শেষ রক্ষা। না হয় অনিবার্য জয়ের দোরগোড়ায় পৌঁছে গিয়েছিল আফগানরা। শেষ ওভারে মাত্র ৮ রান দরকার ছিল। হাতে উইকেট ছিল চারটি। অমন কঠিন ও স্নায়ুক্ষয়ী পরিস্থিতিতে নিজের নার্ভকে ঠিক রেখে প্রতিপক্ষ ব্যাটসম্যানের মতিগতি দেখে-বুঝে, ফিল্ডারের অবস্থান খেয়াল করে সঠিক লেন্থ ও লাইনে বল ফেলে মাত্র দুই রান দিয়েছেন মোস্তাফিজ। লেগবাই থেকে আরও দুই রান যোগ হলেও তার বলথেকে শেষ ছয় বলে দুই রানের বেশী নিতে পারেনি আফগানরা। উল্টো দ্বিতীয় ডেলিভারিতে আফগান লেগস্পিনার রশিদ খান আউট হন তার বলে।

তিন বছর পর ভারতের বিপক্ষে আজ আবার সেই মোস্তাফিজের আগুন ঝরানো বোলিংয়ের দেখা মিলবে ?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *