খেলাধুলা

জয় এক, নায়ক ৫

বিপি ডেস্ক:

ক্রিকেট দলীয় খেলা। জয় দলীয় প্রচেষ্টারই ফসল। কিন্তু কখনো কখনো ‘দলীয় প্রচেষ্টা’কে আড়াল করে নায়ক হয়ে উঠেন একা একজন। ব্যাট হাতে অসাধারণ ইনিংস বা বল হাতে দুর্দান্ত বোলিংয়ের সুবাদে ম্যাচটা করে নেন একার। কিন্তু বাংলাদেশ ঢাকা টেস্টে ২১৮ রানের বিশাল যে জয়টা পেল, সেটিকে ‘দলীয় প্রচেষ্টা’রও বলা যাচ্ছে না! আবার একক নায়কের জয়ও না। সিরিজে সমতা ফেরানো স্বস্তির এই জয়ের নায়ক আসলে ৫ জন।

দলের অংশীদার হিসেবে একাদশে ঠাঁই পাওয়া ১১ জনেরই কম-বেশি অবদান আছে। কিন্তু লিটন দাস, ইমরুল কায়েস, মোস্তাফিজুর রহমান, অভিষিক্ত খালেদ আহমেদ, আরিফুল হকরা এই টেস্টে যা পারফর্ম করেছেন, তাতে তারা নিজেরাও হয়তো নিজেদের জয় কৃতিত্ব দিতে রাজি হবেন না! কেন? সেই ব্যাখ্যায় পরে আসছি। তার আগে ম্যাচের আসল ৫ নায়কের খোঁজটা নিয়ে নিই।

উপরোক্ত ওই ৫ জনের বাইরে মোহাম্মদ মিঠুন দ্বিতীয় ইনিংসে ৬৭ রানের ইনিংস খেলেছেন। দলের বিপর্যয়ের মুখে অধিনায়ক মাহমুদউল্লাহ’র সঙ্গে ১১৮ রানের জুটি গড়েছেন। কিন্তু তারপরও তিনিও হয়তো নিজেকে নায়ক দাবি করবেন না। কারণ, পারফরম্যান্স দ্র্যুতিতে অন্য ৫ জন তার চেয়ৌ অনেক অনেক এগিয়ে। জয়ের ছবি আঁকা সেই ৫ নায়ক হলেন মুমিনুল হক, মুশফিকুর রহীম, মাহমুদউল্লাহ, তাইজুল ইসলাম ও মেহেদী হাসান মিরাজ। এর প্রথম তিনজন নায়ক ব্যাট হাতে। দ্বিতীয় দুজন বল হাতে, স্পিনের মায়া ছড়িয়ে।

এই ৫ নায়কের পারফরম্যান্স বিশ্লেষণের আগে প্রথম ৫ জনের অবদানের চিত্রটায় একটু চোখ বুলিয়ে নিই। ওপেনার লিটন দাস দুই ইনিংসে খেলেছেন ৯ ও ৬ রানের ইনিংস। ইমরুল ০ ও ৩। পেস বোলিংয়ে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ভরসা মোস্তাফিজ প্রথম ইনিংসে ৬৮ রান দিয়ে উইকেট পাননি। দ্বিতীয় ইনিংসে নিয়েছেন ১টি। অভিষিক্ত খালেদ আহমেদ দুই ইনিংস মিলিয়েই উইকেটশূন্য। আরিফুল হক প্রথম ইনিংসে ১টি উইকেট নিলেও দ্বিতীয় ইনিংসে শূন্য। ব্যাট হাতেও অবদান নেই তাদের।

এই পারফরম্যান্স দিয়ে এই ৫ জন কি করে দলের জয়ের কৃতিত্ব দাবি করবেন! যে সুখ তৃপ্তি তারা পাচ্ছেন, সেটা শুধু দলের অংশীদার হিসেবেই। অন্য দিকে মুশফিক, মুমিনুল, মাহমুদউল্লাহ, তাইজুল, মিরাজরা দলের অংশীদার কৃতিত্বের পাশাপাশি ব্যক্তিগতভাবেও তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলতে পারছেন।

এই ৫ নায়কের মধ্যেও আবার বড় নায়ক মুশফিক। দেশের প্রথম ক্রিকেটার হিসেবে টেস্টে দ্বিতীয় ডাবল সেঞ্চুরি করেছেন। ২১৯ রানের সেই ইনিংসটা তিনি আবার খেলেছেন দলের ধ্বংসস্তূপের মধ্যে দাঁড়িয়ে। সিলেটে প্রথম টেস্টে হেরে যাওয়ায় সিরিজ বাঁচাতে ঢাকা টেস্টে বাংলাদেশকে জিততেই হতো। এমন কঠিন সমীকরণের ম্যাচেও বাংলাদেশের শুরুটা হয়েছিল ভয়াবহ। টস জিতে ব্যাটিংয়ে নেমে টেস্টের প্রথম দিনের প্রথম সকালে মাত্র ২৬ রানেই হারিয়ে ফেলে ৩ উইকেট।

ড্রেসিংরুমে কাঁপন ছড়িয়ে একে একে ফিরে যান ইমরুল কায়েস, লিটন দাস ও মোহাম্মদ মিঠুন। এই সেমি-ধ্বংসস্তূপের মুখে দাঁড়িয়ে পাল্টা প্রতিরোধ গড়েন মুমিনুল হক ও মুশফিকুর রহীম জুটি। ধীরে ধীরে বিপদ কাটিয়ে তারা দলকে নিয়ে যান হিমালয়ের চূড়ার দিকে। চতুর্থ উইকেটে দুজনে গড়েন ২৬৬ রানের জুটি। তাদের এই জুটিতেই আঁকা হয়ে যায় জয়ের প্রাথমিক নকশাটা।

অসাধারণ এই জুটি গড়ার পথে মুমিনুল খেলেন ১৬১ রানের দুর্দান্ত এক ইনিংস। পরে তাকে ছাপিয়ে মুশফিক খেলেন আরও বড় ইনিংস, দ্বিতীয় ডাবল সেঞ্চুরির ইনিংসটা তার শেষ হয় ২১৯ রানে। তাদের এই জুটি ইনিংসের সুবাদে ৭ উইকেটে ৫২২ রান করে ইনিংস ঘোষণা করার বিলাসিতাও দেখায় বাংলাদেশ। এই বিলাসিতা বাংলাদেশ দেখিয়েছে দ্বিতীয় ইনিংসেও। তবে তার আগে যথারীতি কেঁপেছে।

প্রথম ইনিংসে বাংলাদেশের ৫২২ রানের জবাবে জিম্বাবুয়ে অলআউট হয় ৩০৪ রানে। মানে বাংলাদেশ পায় ২১৮ রানের লিড। চাইলে মাহমুদউল্লাহ সফরকারী জিম্বাবুয়েকে ফলোঅন লজ্জা দিতে পারতেন। কিন্তু আধুনিক ক্রিকেটে কোনো অধিনায়কই প্রতিপক্ষকে দিয়ে ফলোঅন করানোয় তেমন সুখ পান না! প্রতিপক্ষ ফলোঅন লজ্জা না দিয়ে বরং দলের জয়ের কথা ভেবে নিজেরাই নেমে পড়ে ব্যাটিংয়ে। মাহমুদউল্লাহও বর্তমান এই রীতিই অনুসরণ করেন।

কিন্তু তা করতে গিয়েই বিপদে পড়ে যায় বাংলাদেশ। বড় লিড হাতে নিয়ে দ্বিতীয় ইনিংসের শুরুতেই ধ্বংসস্তূপ। মাত্র ২৫ রানেই হারিয়ে বসে ৪ উইকেট। তার মধ্যে আছেন প্রথম ইনিংসের দুই নায়ক মুমিনুল ও মুশফিকও। এবার মুমিনুল ১ ও মুশফিক করেন মাত্র ৭ রান। দলের এই চরম বিপদে মোহাম্মদ মিঠুনকে নিয়ে হাল ধরেন অধিনায়ক মাহমুদউল্লাহ। বিপদ কাটিয়ে দুজনে গড়েন ১১৮ রানের জুটি। মিঠুন ৬৭ রান করে আউট হলেও একপ্রান্ত আগলে রেখে সেঞ্চুরি করেন মাহমুদউল্লাহ।

যেটি টেস্টে তার দীর্ঘ ৮ বছর পর সেঞ্চুরি। এবং ক্যারিয়ারের দ্বিতীয় টেস্ট সেঞ্চুরি। টেস্টে প্রথম সেঞ্চুরিটি তিনি করেছিলেন ২০১০ সালে, নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে। তার এই সেঞ্চুরির সুবাদেই ৫ উইকেটে ২২৪ রান করে দ্বিতীয় ইনিংস ঘোষণা করে বাংলাদেশ। এছাড়া প্রথম ইনিংসেও ৩৬ রানের ইনিংস খেলেন মাহমুদউল্লাহ।

এবার আসি বল হাতের দুই নায়কের কথায়। টেস্টে নিশ্চিতভাবেই বাংলাদেশের বোলিংয়ের সবচেয়ে বড় ভরসা সাকিব আল হাসান। কিন্তু চোটের কারণে তিনি এই সিরিজে দলেই ছিলেন না। তার শূন্যতা ভালোভাবেই পূরণ করেছেন তাইজুল। সিলেটে প্রথম টেস্টে নিয়েছেন ১১ উইকেট। প্রথম ইনিংসে ৬টি, দ্বিতীয় ইনিংসে ৫টি। সেই ধারাবাহিকতা তিনি ধরে রাখেন ঢাকা টেস্টেও। প্রথম ইনিংসে তিনি নিয়েছেন ৫ উইকেট। তার স্পিনে পুড়েই ৩০৪ রানে থেমে যায় জিম্বাবুয়ের দৌড়।

তাইজুল দ্বিতীয় ইনিংসেও নিয়েছেন ২টি উইকেট। সেই দুটি উইকেটও গুরুত্বপূর্ণ। আউট করেছেন চারি ও সিকান্দার রাজাকে। এই ৪ জনে মিলে প্রথম ৪ দিনে জয়ের যে ক্যানভাসটা তৈরি করেছিলেন, সেটিও ভেস্তে যেতে পারত। কিন্তু সতীর্থদের প্রচেষ্টা ব্যর্থ হতে দেননি মেহেদী হাসান মিরাজ। খুলনার ছেলে বল হাতে শেষ দিনে জ্বলে উঠে দলকে এনে দিয়েছেন অনেক স্বস্তির এক জয়। শেষ দিনের মধ্যাহ্ন বিরতি পর্যন্তও মাত্র ৪ উইকেট হারিয়েছিল জিম্বাবুয়ে। তাদের হাতে ছিল আরও ৬টি উইকেট। কার্যত ৫টি। কারণ চোটের কারণে চাতারা ব্যাটিং করতে পারবেন না, সেটা নিশ্চিত হয়ে যায় আগেই।

যাই হোক, হাতে ৫ উইকেট। সেশন বাকি মাত্র দুটি। উইকেটেও তখন জিম্বাবুয়ের সবচেয়ে বড় দুই ভরসা, বাংলাদেশের যম ব্রেন্ডন টেলর ও পিটার মুর। প্রথম ইনিংসেও এই ‍দুজনই জ্বালিয়েছেন বাংলাদেশকে। খেলেছেন লম্বা ইনিংস। তারা উইকেট থাকায় শঙ্কা ছিলই। কিন্তু মধ্যাহ্ন বিরতি থেকে ফিরেই স্পিনের মায়া ছড়িয়ে সেই শঙ্কা মিরপুর শেরে বাংলাদেশের আকাশে হাওয়ার সঙ্গে মিলিয়ে দেন মিরাজ। তার স্পিনবিষে মুহূর্তেই ৪ উইকেট হারিয়ে ফেলে জিম্বাবুয়ে। শেষ পর্যন্ত চা বিরতিরও আধ ঘণ্টা আগেই ম্যাচ শেষ। ৪৪৩ রানের লক্ষ্যে ব্যাটিংয়ে নেমে জিম্বাবুয়ে অলআউট ২২৪ রানে।

দলের জয়ে শেষ কাজটুকু সারতে মিরাজ দ্বিতীয় ইনিংসে নিয়েছেন ৫ উইকেট। টেস্টে এ নিয়ে পঞ্চম বারের মতো ৫ উইকেট নিলেন তিনি। এর আগে প্রথম ইনিংসেও ৩ উইকেট নিয়েছেন মিরাজ। মানে ম্যাচে মোট ৮ উইকেট শিকার তার। পাশাপাশি ব্যাট হাতেও কার্যকর দুটি ইনিংস। প্রথম ইনিংসে খেলেছেন অপরাজিত ৬৮ রানের ইনিংস।

দ্বিতীয় ইনিংসে অপরাজিত ২৭। একটা টেস্টে একজন ক্রিকেটারের পক্ষে এমন অলরাউন্ড পারফর্ম করা স্বপ্নের মতোই ব্যাপার। তারপরও তাকে ছাপিয়ে বাংলাদেশের জয়ের সবচেয়ে বড় নায়ক মুশফিক। ডাবল সেঞ্চুরির সুবাদে যিনি পেয়েছেন ম্যাচসেরার পুরস্কার। তবে তা নিয়ে মুমিনুল, মাহমুদউল্লাহ, তাইজুল, মিরাজদের আফসোস থাকার কথা নয়। দলেল জয়ে বড় অবদান রেখেছেন, এর চেয়ে স্বস্তির আর কি আছে!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *