রাজনীতি

নতুন রূপে ৫৭ ধারা, সাংবাদিকদের উদ্বেগ

বহুল আলোচিত ডিজিটাল নিরাপত্তা বিল পাস হয়েছে জাতীয় সংসদে। এই আইনের বিভিন্ন ধারা নিয়ে সাংবাদিকদের আপত্তি থাকলেও তা আমলে নেওয়া হয়নি। বরং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) আইনের বিতর্কিত ৫৭ ধারাকে ভিন্নভাবে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে সংযোজন করা এবং ঔপনিবেশিক আমলের ‘অফিসিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট ১৯২৩’কে এই আইনের ৩২ ধারায় সংযুক্ত করার মাধ্যমে তা গণমাধ্যমকর্মীদের মধ্যে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।

সংসদে পাস হওয়া ডিজিটাল নিরাপত্তা বিল পর্যালোচনা করে দেখা যায়, আইসিটি আইনের ৫৭ ধারাকে বিলুপ্ত করা হলেও ওই ধারার বিষয়বস্তুকে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ২৫, ২৮, ২৯ ও ৩১ ধারায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। আবার ৩২ ধারায় ‘অফিসিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট ১৯২৩’ যুক্ত করার মাধ্যমে সরকারি দফতরের তথ্য সংগ্রহের প্রক্রিয়ায় গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগ আনার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। এছাড়াও নতুন আইনে ১৪টি ধারায় জামিন অযোগ্য অপরাধের কথা বলা হয়েছে।

এ ব্যাপারে বাংলাদেশ ফেডারেশন সাংবাদিক ইউনিয়নের (বিএফইউজে) সাবেক সভাপতি ও একুশে টিভির প্রধান নির্বাহী মনজুরুল আহসান বুলবুল সারাবাংলাকে বলেন, এই আইনে সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় ৩২ ধারা। এই ধারাটি অনুসন্ধানী সংবাদিকতাকে বাধাগ্রস্ত করবে। ধারাটিতে ১৯২৩ সালের ‘অফিসিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট’ সংযুক্ত করে সাংবাদিকতায় গুপ্তচরভিত্তির অভিযোগ আনা হয়েছে। এটি কাম্য ছিল না।

তিনি বলেন, এছাড়াও তথ্যপ্রযুক্তির আইনের ৫৭ ধারার আপত্তিজনক বিষয়গুলো নানা কৌশলে এখানে নিয়ে আসা হয়েছে।

মনজুরুল আহসান বুলবুল বলেন, সাংবাদিক সমাজের আপত্তি সত্ত্বেও এই ধরনের একটি আইন পাস হওয়ায় আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে বাংলাদেশের সাংবাদিকতার সূচক আরও নিচে নেমে যাবে। যেভাবে আইনটিকে জেল-জরিমানা কথা বলা হয়েছে, কোনো সাংবাদিক অনিচ্ছাকৃতভাবেও যদি কোনো ভুল করেন, তার পক্ষ এই পরিমাণ অর্থদণ্ড দিয়ে ছাড়া পাওয়া সম্ভব হবে না।

বাংলাদেশ ফেডারেশন সাংবাদিক ইউনিয়নের (বিএফইউজে) একাংশের সভাপতি মোল্লা জালাল সারাবাংলাকে বলেন, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন সংসদে পাস হওয়ায় সাংবাদিক সমাজে মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। এই মিশ্র প্রতিক্রিয়ার কারণে এটি কালো আইন হিসেবে চিহ্নিত হবে। কালো আইনে মানুষ কখনও ন্যয়বিচার পায় না।

বিএফইউজে সভাপতি বলেন, বিগত দিনে অনেক সরকারই কালো আইন করেছে, কিন্তু ঠিকিয়ে রাখতে পারেনি। এই আইনটিও টিকবে না।

বিএফইউজে’র অন্য অংশের সভাপতি রুহুল আমিন গাজীও বলছেন, এই আইন স্বাধীন সাংবাদিকতার পথে বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা। তিনি সারাবাংলাকে বলেন, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন পাসের মধ্যে দিয়ে স্বাধীন সাংবাদিকতার কবর রচনা করা হলো। এই আইন পাসের মধ্যে দিয়ে আমরা ডিজিটাল যুগ থেকে আবারও অন্ধকার যুগে ধাবিত হলাম।

তিনি বলেন, এই কালো আইন সাংবাদিকদের পক্ষে মানা সম্ভব না। এই আইন মানলে স্বাধীন সাংবাদিকতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, মানুষের মৌলিক অধিকার বলে কিছুই থাকবে না। এই আইন সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক ও তথ্য অধিকার আইনের সঙ্গেও সাংঘর্ষিক।

জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকরা বলছেন, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনটি এমনভাবে করা হয়েছে, অনলাইনে যেকোনো তথ্য আদান-প্রদানকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করে আইনশৃঙ্খলাবাহিনী কোনো পরোয়ানা ছাড়াই কাউকে আটক করে বিচারের আওতায় নিয়ে আসতে পারবে। শুধু তাই নয়, বিশ্বের যেকোনো জায়গায় বসে বাংলাদেশের নাগরিকরা এই আইন লঙ্ঘন করলে তাকে শাস্তির আওতায় আনা যাবে।

এই আইনটিকে স্বাধীন মতপ্রকাশের ক্ষেত্রে অন্তরায় এবং আইনের ৩২ ধারায় ডিজিটাল উপায়ে তথ্য সংগ্রহকে গুপ্তচরভিত্তির অভিযোগ আনায় অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে এটি সবচেয়ে বড় বাধা হিসেবে বিবেচনা করছেন গণমাধ্যমকর্মীরা। ফলে আইনটি পাসের আগে থেকেই এর কিছু ধারা বাতিল ও সংশোধন করতে সম্পাদক পরিষদ, বিভিন্ন সাংবাদিক সংগঠন, সুশীল সমাজ এবং দেশ-বিদেশি বিভিন্ন সংস্থা দাবি জানায়। তবে এসব দাবি উপেক্ষা করেই বুধবার রাতে জাতীয় সংসদে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনটি পাস করা হয়েছে বলে ক্ষোভ জানান সাংবাদিক সমাজ।

কী আছে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ৩২ ধারায়

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ৩২ ধারায় বলা হয়েছে, যদি কোনো ব্যক্তি বেআইনি প্রবেশের মাধ্যমে কোনো সরকারি, আধাসরকারি ও স্বায়ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠানে অতি গোপনীয় বা গোপনীয় তথ্য ডিজিটাল বা ইলেকট্রনিক মাধ্যমে ধারণ, প্রেরণ ও সংরক্ষণ করেন বা সহায়তা করেন, তাহলে কম্পিউটার বা গুপ্তচরভিত্তির অপরাধ বলে গণ্য হবে। এজন্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি অনধিক ১৪ বছরের কারাদণ্ড বা ২৫ লাখ টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন। একই অপরাধ দ্বিতীয়বার বা একাধিকবার করলে যাবজ্জীবন বা এক কোটি টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।

কী ছিল তথ্যপ্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারায়

ডিজিটাল নিরাপত্তা বিল পাসের মাধ্যমে আইসিটি আইনের বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া ৫৭ ধারায় ইলেকট্রনিক ফর্মে মিথ্যা, অশ্লীল বা মানহানিকর তথ্য প্রকাশ সংক্রান্ত অপরাধ ও এর দণ্ড সর্ম্পকে বলা ছিল, (এক) কোনো ব্যক্তি যদি ওয়েবসাইটে বা অন্য কোনো ইলেকট্র্রনিক বিন্যাসে এমন কিছু প্রকাশ বা সম্প্রচার করেন, যা মিথ্য ও অশ্লীল বা সংশ্লিষ্ট অবস্থা বিবেচনায় কেউ পড়লে, দেখলে বা শুনলে নীতিভ্রষ্ট বা অসৎ হতে উদ্ধুদ্ধ হতে পারেন অথবা যার দ্বারা মানহানি ঘটে, আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটে বা ঘটার সম্ভাবনা তৈরি হয়, রাষ্ট্র ও ব্যক্তির ভাবমুর্তি ক্ষুণ্ন হয় বা ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করে বা করতে পারে বা এ ধরনের তথ্যের মাধ্যমে কোনো ব্যক্তি বা সংগঠনের বিরুদ্ধে উসকানি দেওয়া হয়, তাইলে তার এই কাজ হইবে একটি অপরাধ। (২) কোনো ব্যক্তি উপ-ধারা (১)-এর অধীন অপরাধ করল তিনি অনধিক ১৪ বছর এবং নূন্যতম সাত বছর কারাদণ্ড এবং অনধিক ১ কোটি টাকা অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হবেন।

যেভাবে ৫৭ ধারা সন্নিবেশিত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে

সম্পাদক পরিষদ ও সাংবাদিকরা বলছেন, তথ্যপ্রযুক্তি আইনের বির্তকিত ৫৭ ধারার বিষয়বস্তু ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের চারটি (২৫, ২৮, ২৯ ও ৩১) ধারায় ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এই আইনের ২৫ ধারায় বলা হয়েছে, কেউ যদি ওয়েবসাইট বা ডিজিটাল মাধ্যমে ভয়ভীতি দেখায়, তাহলে তাকে তিন বছরের কারাদণ্ড ও তিন লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ড দেওয়া যাবে। ২৮ ধারায় বলা হয়েছে, কেউ যদি ধর্মীয় বোধ ও অনুভূতিতে আঘাত করে, তাহলে তাকে ১০ বছরের কারাদণ্ড ও ২০ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ড দেওয়া যাবে।

অন্যদিকে, ২৯ ধারায় মানহানির শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। এটি আগের আইসিটি আইনের ৫৭ ধারায় ছিল। ৫৭ ধারায় শাস্তি ছিল ১৪ বছর কারাদণ্ড এবং এ অপরাধ ছিল জামিন অযোগ্য। বর্তমানে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ২৯ ধারায় বলা হয়েছে, কেউ মানহানিকর তথ্য দিলে তাকে তিন বছরের কারাদণ্ড এবং পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন। পাশাপাশি এই আইনের ৩১ ধারায় ডিজিটাল মাধ্যম ব্যবহার করে কেউ অরাজকতা তৈরি করলে তার সাত বছরের কারাদণ্ড ও পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *