রাজনীতি

রাজনীতি এখন গরিবের ভাউজ: রাষ্ট্রপতি

রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ বলেছেন, আমাদের গ্রামে একটা প্রবাদ আছে গরিবের বউ সবার ভাউজ (ভাবি)। এখন রাজনীতি গরিবের ভাউজের মতো হয়ে গেছে। ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার সবাই রাজনীতি করে। এই ধারা থেকে বের হয়ে আসতে সরকার ও বিরোধী দলের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫১তম সমাবর্তনে শনিবার (৬ অক্টোবর) দুপুরে সভাপতির বক্তব্যে তিনি এই আহ্বান জানান।

রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ তার বক্তব্যে বলেন, আমি যদি বলি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিজিক্সের প্রফেসর হতে চাই, ভিসি স্যার নেবেন না। বা আমি আমি যদি কোনো হাসপাতালে গিয়ে বলি এত বছর রাজনীতি করেছি আমাকে ডাক্তার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হোক, বোঝেন অবস্থাটা কী হবে। ফিজিক্স, কেমিস্ট্রি পড়াতে যাব এ কথা বললে হাসির পাত্র হওয়া ছাড়া কিছুই হবে না। কিন্তু রাজনীতি গরিবের ভাউজের মতো হয়ে গেছে। ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার সবাই রাজনীতি করে। আর্মির জেনারেল, সেনা প্রধানরাও অবসরে গিয়ে বলে- আমিও রাজনীতি করব। সরকারি সচিব, প্রিন্সিপাল সেক্রেটারি, কেবিনেট সেক্রেটারি অবসরে যাওয়ার পরে বলে যে, আমি রাজনীতি করব। কোনো নিয়মের বালাই নেই। যে যখন ইচ্ছা রাজনীতিতে ঢোকে। ব্যবসায়ী-শিল্পপতিরা তো আছেই। এগুলোকে থামানো দরকার। প্রথম থেকে যারা রাজনীতি করে আসছে তারাই থাকুক। এক্সপার্টদের প্রয়োজন আছে। বিশেষজ্ঞ হিসেবে তাদের মতামত নেন, এতে কোনো বাধা নেই। কিন্তু ডিরেক্ট রাজনীতিতে এসে তারা ইলেকশন করে মন্ত্রী হয়ে যাবে, এটা যেন কেমন কেমন লাগে।

রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ

রাষ্ট্রপতি বলেন, ডাকসু নির্বাচন নিয়ে একটা আশার আলো দেখা যাচ্ছে। তবে আমি ছাত্র সমাজের কাছে বিনীতিভাবে অনুরোধ জানাই, নির্বাচনের তফসিল হলে অনেক ধরনের ক্যালকুলেশন হবে। অনেকে ভেজাল সৃষ্টি করে দিতে পারে। অনেকে অনেক স্বার্থে এসব করবে। কিন্তু আমি মনে করি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমস্ত ছেলে-মেয়েকে বঞ্চিত করা আপনাদের ঠিক হবে না। ৬০-এর দশকের ছাত্র রাজনীতির সঙ্গে বর্তমান ছাত্র রাজনীতির পার্থক্য অনেক। সেই সময়ের ছাত্র রাজনীতি ছিল আদর্শভিত্তিক। সেখানে ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর স্বার্থ ছিল না। পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে দেশকে মুক্ত করাই ছিল মূল লক্ষ্য। সেই আদর্শকে ধারণ করে ১৯৭১ সালে জাতির পিতার নেতৃত্বে আমরা দেশ স্বাধীন করেছি। এখন আমরা স্বাধীন সার্বভৌমত্ব দেশের নাগরিক। স্বাধীনতার সংগ্রাম শেষ হয়েছে কিন্তু দেশ গড়ার সংগ্রাম শেষ হয়নি। সাম্য ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গড়ার যে প্রত্যয় ছিল, তা আজও পরিপূর্ণভাবে অর্জিত হয়নি। তাই দেশ গড়ার কাজে নবীন গ্রাজুটেদের নেতৃত্ব দিতে হবে। জাতির পিতার ‘ক্ষুধা ও দারিদ্র মুক্ত’ বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন পূরণ করতে হবে।

গ্রাজুয়েটদের উদ্দেশে তিনি বলেন, নিছক চাকরির জন্য উচ্চ শিক্ষা নয়। উচ্চ শিক্ষার লক্ষ্য হলো নিজে শিক্ষিত হওয়া এবং অন্যকে শিক্ষিত করা। মানবিকবোধ জাগ্রত করা, জীবনকে প্রকৃত অর্থে উপলব্ধি করা। মানবসত্ত্বা দিয়ে পৃথিবীকে আলোকিত করা। উচ্চ শিক্ষা নিয়ে সবাই যে বিত্ত-বৈভবের মালিক হবে এমন না। সেই অর্জনে আমরা কতটুকু এগোতে পেরেছি সেটাই বিবেচ্য বিষয়। একটি সুষ্ঠু ও মেধাভিত্তিক সমাজ গঠন করতে হলে চিত্তকে প্রসারিত করতে হবে। না হলে অশুভ অনৈতিক প্রতিযোগিতা সমাজকে রুদ্ধ করে দেবে।

সান্ধ্যকালীন কোর্সের বিষয়ে সতর্ক থাকার আহ্বান
অপ্রয়োজনীয় ও পুরাতন বিভাগগুলোকে যুগোপযোগী করে ঢেলে সাজাতে হবে। তবে মনে রাখতে হবে, এর সংযোজন-বিয়োজন যাতে কোনো ব্যক্তি বা কতিপয় লোকের স্বার্থে না হয়। দেশ ও জাতির স্বার্থে হয়। ডিপ্লোমা ও সান্ধ্যকালীন কোর্সের নামে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অপরিকল্পিতভাবে বিভিন্ন বিষয়ে ডিগ্রি দেওয়া হচ্ছে। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহ্যের পাশাপাশি স্বাভাবিক লেখাপড়ার পরিবেশ বিঘ্নিত হচ্ছে কি না তা ভাবতে হবে। জাতির বৃহত্তর স্বার্থে ছাত্র শিক্ষক এবং বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তা ভেবে দেখবে। মনে রাখতে হবে, জনগণের অর্থে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালিত হয়। তাই তাদের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।

প্রেমপত্র লেখা চর্চায় রাখার আহ্বান রাষ্ট্রপতির
বক্তব্যের শেষ অংশে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে রসিকতা করেন রাষ্ট্রপতি। তিনি বলেন, ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে আসলে যেন কিছু বলতে চাই। আবার ভয়ও করে। কারণ যে ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হতে পারিনি, সেখানে আবার বক্তৃতা দেওয়া। তাও ভালো ভালো ছাত্রের সামনে বক্তৃতা জাহির করা যাওয়া- ‘ভেরি টাফ’। তবুও বলছি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আসলে ঠাণ্ডা লাগার আগেই যেন গলা বসে যায়। কলেজে পড়ার সময় প্রেমপত্র লিখতাম। প্রেমপত্র লেখার সময় অনেক সময় বন্ধু-বান্ধবের সহযোগিতা নিয়েছি। আমি নিয়েছি, অনেকে নিয়েছে। ভালো কোটেশন কিভাবে লিখলে চিঠিটা সুন্দর হবে। কিন্তু এখন তো দেখি চিঠি লেখা একেবারে বন্ধ হয়ে গেছে। এখন এসএমএস পাঠায়, কি বলে না বলে! দেখা যায়, কোথাও বাংলারে ইংরেজি দিয়ে আবার ইংরেজিরে বাংলা দিয়ে কেমনে যে লেখে! ফেসবুক-টুক আমি আবার বুঝি না। আমি তো ব্যাকডেটেড। টিপে টিপে কল দিতে পারা আর টেলিফোন রিসিভ করার বাইরে কিছু পারি না। আপনারা যে একেবারে প্রেমপত্ররে বিসর্জন দিয়েছেন, প্রেমের যে সাহিত্য সেটা মরাত্মভাবে বিঘ্নিত হয়ে যাচ্ছে। আপানারা প্রেমপত্র লেখার অভ্যাসটা রাখবেন। তাহলে প্রেমপত্রের সাহিত্য বেঁচে থাকবে।

রাষ্ট্রপতি যখন শিক্ষার্থীদের বন্ধু
রসিকতা করে আবদুল হামিদ আরও বলেন, ১৭০ কোটি ২ লাখ ৯২ হাজার ৪শ’ সেকেন্ড আগে বিয়ে হয়েছে। আসলে হয়েছে ৫৪ বছর ২ দিন। ৫৪ বছরে স্ত্রী সব বুঝে গেছে- কী করতে পারি, না পারি। স্পিকার থাকাকালে নারী নির্যাতন বিল পাস করে প্রধানমন্ত্রীকে বলেছিলাম, নারী নির্যাতন বিল পাস হলো ভালো কথা, পুরুষ নির্যাতন বিলও পাস করা প্রয়োজন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী খবর-টবর রাখেন না। আসলে শুধু আমার ঘরে না, সারা বাংলাদেশে কিন্তু পুরুষ নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। কয়েকমাস আগে প্রিয়াংকা চোপড়া ঢাকায় এসেছিলেন। বাইরের দেশের রাষ্ট্রপতি-প্রধানমন্ত্রী কেউ বাংলাদেশে এলে সবশেষে বঙ্গভবনে আসেন। আমার স্ত্রীকে বললাম এইবার তো প্রিয়াংকা চোপড়া আসবে। পরে শুনেছি সে (রাষ্ট্রপতির স্ত্রী) না কি টেলিফোন করে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীরে বলছে ‘প্রিয়াংকা চোপড়ার বঙ্গভবনে আসার কী দরকার’। এটা ষড়যন্ত্র ছিল, শেষ পর্যন্ত বঙ্গভবনে প্রিয়াংকা চোপড়া আসেনি। পরে শুনলাম সে আমেরিকার এক ছেলেকে বিয়ে করেছে, বয়সে তার থেকে ১২-১৪ বছরের কম ছোট। এখন আমি তো তার থেকে ৩০-৩৫ বছরের বড়। ১২-১৪ বছর নিচে যদি সে নামতে পারে, তাহলে তো সে ৩০-৩৫ বছর উপরেও উঠতে পারত। এই সুযোগ নষ্ট করে সে ঠিক করেনি। ঘটনাটা ঘটলে তাকে সাত সাগর তের নদী পার হয়ে আমেরিকায় যেতে হতো না। সবই ভাগ্য, কপাল।

বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় খেলার মাঠে আয়োজিত সমাবর্তনে বক্তা ছিলেন জাতীয় অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামান। উপস্থিত ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য (ভিসি) অধ্যাপক ড. আখতারুজ্জামান, প্রো-ভিসি (শিক্ষা) অধ্যাপক নাসরীন আহমাদ, প্রো-ভিসি (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ সামাত। সমাবর্তনে প্রায় ২১ হাজার গ্রাজুয়েটকে ডিগ্রি প্রদান করা হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *