স্বাস্থ্য

অনিয়মিত পিরিয়ড হলে যা করবেন: ডা. কাজী ফয়েজা আক্তার

একটা মেয়ের বয়স যখন ১২-১৩ হয় তখন তার স্বাভাবিক পিরিয়ড বা মাসিক শুরু হয়। এটাকে আমরা বলি এইজ অব ম্যানারকি (age of menarche)। এই ম্যানারকি এইজ গড়ে তের বছর। তবে কিছু কিছু কিশোরীর মাসিক শুরু হয় একটু আগে হয়।

আবার কারো কারো একটু দেরীতে হয়। সেক্ষেত্রে আমরা তার পারিবারিক কেস হিস্ট্রি দেখি। তার মা, খালা বা বড় বোনের কত বছর বয়সে পিরিয়ড হয়েছিল সেটা শুনি। যদি দেখি পারিবারিকভাবেই তাদের পিরিয়ড দেরীতে হয়, তাহলে বুঝতে হবে সেটা নিয়ে ভয় পাওয়ার বা মাথা ঘামানোর কিছু নাই।

কিন্তু যদি দেখি, পিরিয়ড দেরীতে হওয়ার পাশাপাশি তার শারীরিক পরিবর্তনগুলোও দেরীতে হচ্ছে- যেমন স্তনের বিকাশ হচ্ছে না বা অন্যান্য উপসর্গগুলো দেখা যাচ্ছে না তখন ডাক্তারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে। এক্ষেত্রে তার কিছু হরমোন টেস্টও করা উচিত।

বয়স যখন ১২-১৩
১২-১৩ বছর বয়সে যখন পিরিয়ড শুরু হয় তখন প্রথম প্রথম কিছু সমস্যা হয়। যেমন খুব বেশি ব্লিডিং হয়। খুব বেশি ব্যাথা হয়। এটা প্রথম দু`এক বছর থাকে। কিছু ট্রিটমেন্ট নিলে ঠিক হয়ে যায়।

আবার কোনো কোনো মেয়েদের দু`তিন মাস পিরিয়ড বন্ধ থাকে। তারপর আবার ঠিক হয়ে যায়। প্রথম দু’এক বছর এই অনিয়ম দেখা যায়। তারপর ঠিক হয়ে যায়। এগুলো নিয়ে আমরা মায়েদের কাউন্সিলিং করি।

সন্তানের এমন অবস্থায় মা খুব আপসেট হয়ে যান, মেয়ের শারীরিক কোন সমস্যা আছে কি-না তা নিয়ে দু:শ্চিন্তা শুরু করেন। এই যেটা মেয়েদের খুব কমন সমস্যা- আমরা যেসব পেশেন্ট নিয়মিত পাই, সেটা হলো আঠারো বছরের বেশি বয়সের মেয়েদের মাসিক নিয়মিত হয় না। কারো দু`মাস, কারো তিন মাস, কানো ছ`মাস পরে হয়।

কেউ কেউ বলেন বছর পার হয়ে যায়, তবু পিরিয়ড হয় না। আমরা দেখি এসব মেয়েদের শারীরিক ওজন খুব বেশি থাকে। ওবেসিটি বা শারীরিক ওজন বেশী থাকা একটা গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা যা পিরিয়ডের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত।

স্থূলকায় মেয়েদের আমরা প্রথমেই বলি, ওজন কমান। ওজন যদি কমাতে পারেন পাঁচ- দশ কেজি তাহলে দেখবেন পিরিয়ড স্বাভাবিকভাবে হচ্ছে।
আমরা ( ডাক্তার) ওষুধ দিয়ে পিরিয়ড করাতে পারি। কিন্তু ওজন যদি না কমানো হয় তাহলে দেখা যাবে পরের মাস থেকে বা কয়েকমাস পরে আবার পিরিয়ড অনিয়মিত হয়ে গেছে। এক্ষেত্রে লাইফস্টাইল পরিবর্তন করতে হবে।

চর্বি জাতীয় খাবার, চকলেট, ফাস্টফুড পরিত্যাগ করতে হবে। নিয়মিত ব্যায়াম করতে হবে। প্রয়োজনে জিমে যেতে হবে। প্রয়োজনে কোনো পুষ্টিবিদের সঙ্গে যোগাযোগ করে ডায়েট চার্ট ফলো করতে হবে। এভাবে ওজন কমানো সম্ভব।

নারীর বয়স যখন ৩০’র বেশি
নারীর বয়স যখন ৩০- ৩৫ হয় তখন তারা পিরিয়ড সংক্রান্ত যে কমন সমস্যা নিয়ে আমাদের কাছে আসে সেটা হলো, চাকা চাকা প্রচুর ব্লাড যাচ্ছে। প্রচুর ব্যথা হচ্ছে। পিরিয়ডের ব্যথায় তাকে ডাক্তারের কাছে ভর্তি হতে হয় বা ডাক্তারের শরনাপন্ন হতে হয়। তখন আমরা তাদের একটা আল্ট্রাসাউন্ড দিই। তখন দেখা যায় জরায়ুতে টিউমার সংক্রান্ত বা কিছু সমস্যা রয়েছে। বা ইনফেকশান রয়েছে।

সত্যি কথা হচ্ছে- ৩৫-৪০ বছর বয়সে জরায়ুতে টিউমার বা ইনফেকশান থাকা খুব কমন সমস্যা। যদি টিউমার হয় তাহলে অস্ত্রোপচার করে টিউমার বের করে আনতে হবে।

এক্ষেত্রে দুটি অপশন আছে। যদি ওই নারীর বয়স ৩৫ বা তার কাছাকাছি হয় তাহলে আমরা শুধু টিউমার টা অপসারণ করি। কিন্তু যদি বয়স ৪৫ বা ৪৮ বা এরকম কিছু হয় তাহলে অপারেশন করে টিউমারের সঙ্গে জরায়ুটা ফেলে দিই।

নারীর বয়স যখন ৫০ এর বেশি
আর যদি কোনো নারী বয়সের দিক থেকে পিরিয়ডের সময়সীমা পার করে আসেন অর্থাৎ বয়স ৫০-৫৫ বা এরকম কিছু তিনি যদি হঠাৎ করে দেখেন তার একটু একটু ব্লিডিং হচ্ছে (হয়তো গত পাঁচ সাত বছর ধরে তার পিরিয়ড বন্ধ) তখন তিনি ভয় পেয়ে আমাদের ( ডাক্তার) কাছে চলে আসেন।

এটাও পিরিয়ড সংক্রান্ত একটা সমস্যা। তখন আমরা কিছু পরীক্ষা করি। জরায়ুর ভেতরের যে স্তর সেখানে বা জরায়ুর মুখে যেকোনো ধরনের ক্যান্সারের লক্ষ্মণ ব্লিডিংয়ের কারণ হতে পারে। যদি সেরকম কোনো কারণ ধরা পরে তা দেখে আমরা চিকিৎসা শুরু করি।

এরকম কোনো লক্ষ্মণ দেখা গেলে অবহেলা না করে সঙ্গে সঙ্গে ডাক্তারের শরনাপন্ন হওয়া উচিত। সব ধরনের হাসপাতালে এর চিকিৎসা আছে এবং সব গাইনোকোলজিস্টরা এর চিকিৎসা করে থাকেন।

**লেখক: ডা. কাজী ফয়েজা আক্তার (এমবিবিএস, এফসিপিএস, এমসিপিএস) কনসালটেন্ট, ইমপালস হাসপাতাল ও সহকারী অধ্যাপক, গাইনী, প্রসূতি রোগ বিশেষজ্ঞ ও সার্জন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *