স্বাস্থ্য

মাসাজ যখন ম্যাজিক করে !

 

ব্যাথা কমানো, ক্লান্তি দূর, স্ট্রেস থেকে মুক্তি, ওজন কমানো, বডি শেপিং, এমনকি রোগ নিরাময়ের জন্যও জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে মাসাজ। আর মাসাজের প্রতি আগ্রহ ও এর চাহিদা বাড়ায় নানা ধরণের মাসাজ সেবা দিচ্ছে নগরের ওয়েলনেস সেন্টারগুলো। সেখানে প্রতিদিন মাসাজ নিতে আসা মানুষের সংখ্যাও বাড়ছে।

প্রাচীনকাল থেকেই মানুষ বিভিন্ন রোগের চিকিৎসায় মাসাজ পদ্ধতি ব্যবহার করত। প্রাকৃতিক উপাদানে তৈরি বিভিন্ন ধরনের তেল মাসাজে ব্যবহৃত হত। প্রত্নতত্ত্ববিদেরা মাসাজের উৎস খুঁজে পেয়েছিলেন চীন, জাপান, কোরিয়া, মিসর, রোম, গ্রীস, ভারত ও মেসোপটেমিয়াতে। ২৫০০ খ্রিষ্টাব্দে চীনের মার্শাল আর্টিস্টরা শরীরের ব্যথা কমাতে, মাংসপেশির সুরক্ষায় ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোর জন্য মাসাজ করাতেন। ৩০০০ খ্রিষ্টাব্দে ভারতবর্ষের চিকিৎসায় মাসাজের প্রচলন শুরু হয়। পরবর্তীতে জাপান, গ্রীস, রোম ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশের চিকিৎসাশাস্ত্রে মাসাজ প্রাধান্য পায়।

চিকিৎসাবিজ্ঞানের আদি ধারা আয়ুর্বেদ। আয়ুর্বেদ চিকিৎসার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো মাসাজ।

আদিযুগের চিকিৎসা পদ্ধতিতে মাসাজ প্রয়োজনীয় অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়েছিল। চিকিৎসাশাস্ত্রকে সমৃদ্ধ করে এমন কিছু বই সেসময় প্রকাশিত হয়েছিল, যে বইগুলোতে মাসাজের গুণাগুণ নিয়ে আলোচনা ছিল।

৪৮১ খ্রিষ্টাব্দে হুয়াইদি নেইজিং নামে একটি বই প্রকাশিত হয়। এই বইয়ের ৩০টি অধ্যায়ে বিভিন্ন ধরনের মাসাজ সম্পর্কে তথ্য ছিল।

প্রাচীন গ্রীসের চিকিৎসাশাস্ত্রকে সমৃদ্ধ করে আরেকটি বই। হিপোক্রেটিক কর্পাস নামের এই বইটি রচনা করেন হিপোক্রেটিক। লেখক তার বইয়ে মাসাজের পদ্ধতি ও উপকারিতা নিয়ে আলোচনা করেছেন।

পৃথিবীর ইতিহাসে অন্যতম শ্রেষ্ঠ চিকিৎসাবিজ্ঞানী ইবনে সিনা ১০২৫ খ্রিষ্টাব্দে দ্য ক্যনন অফ মেডিসিন নামে একটি বই রচনা করেন, যা অত্যন্ত সাড়া জাগায়। মধ্যযুগে ইউরোপের প্রায় প্রত্যেকটি দেশের মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এই বইটি পড়ানো হতো। পাঁচ খন্ডের এই বইটিতে মাসাজের উপকারিতা নিয়ে বিস্তারিত লিখেছিলেন ইবনে সিনা।

চিকিৎসা বিজ্ঞানে মাসাজের উপকারিতা নিয়ে আলোচনা শুরু হলে ফ্রান্স ও সুইডেনসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের বিজ্ঞানীরা এটি নিয়ে গবেষণা করেন। এরই ধারাবাহিকতায় পরবর্তীতে ফিজিওথেরাপির প্রচলন শুরু হয়। আমাদের দেশে এখন মূলধারার চিকিৎসায় ফিজিওথেরাপি অত্যন্ত জনপ্রিয়।

শারীরিক ও মানসিক সুস্থতার জন্য মাসাজ খুব কার্যকরী। দেহ ও মনের ক্লান্তি শিথিল করতে, ব্যথা ও ওজন কমাতে মাসাজ উপকারি। মাসাজ দেহের স্নায়ুগুলো সতেজ করে, রক্ত সঞ্চালন প্রক্রিয়া স্বাভাবিক করে ও রক্তে অক্সিজেনের সরবরাহ বাড়ায়। ফলে শারীরিক সুস্থতায় মাসাজ গুরুত্বপূর্ণ।

হেলথ অ্যান্ড হোপ হাসপাতালের প্রিভেনটিভ মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী বলেন, মাসাজ হলো মাংসপেশিকে নাড়িয়ে দেওয়ার এক ধরনের পদ্ধতি। এতে রক্তবাহী নালী প্রসারিত হয়। রক্তে অক্সিজেন সরবরাহ বেড়ে যায়। মাসাজ করলে শরীরে গরম ভাব চলে আসে, যা ক্লান্তি দূর করতে সাহায্য করে। পৃথিবীর সব দেশেই মাসাজ আছে। চিকিৎসাবিজ্ঞানে মাসাজ খুব গুরুত্বপূর্ণ।

ডা. লেলিন বলেন, মাসাজ সরাসরি শরীর থেকে টক্সিন বের করে দেয় না, তবে টক্সিন বের করতে সাহায্য করে। মানুষের শরীর থেকে টক্সিন বের হয় তিনভাবে- মল, ঘাম ও শ্বাসের মাধ্যমে। মাসাজ করলে দেহের কোষগুলো সচল হয় ও শক্তি পায়। তখন শরীর ক্ষতিকর উপাদানগুলোকে সহজে বর্জন করতে পারে এবং উপকারী উপাদানগুলোকে গ্রহণ করতে পারে।

মাসাজ করার আগে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। কিছু রোগের ক্ষেত্রে মাসাজ কার্যকর আবার কিছু রোগের ক্ষেত্রে মাসাজ ক্ষতিকর। যেমন Fibromyalgia (পুরো শরীরের মাংসপেশীতে ব্যাথা হয় এবং মাংসপেশী শক্ত হয়ে যায়) রোগের বেলায় মাসাজ করলে উপকার পাওয়া যায়। আবার কিছু রোগের ক্ষেত্রে মাংসপেশিকে আরাম দিতে হয়। সেক্ষেত্রে মাসাজ করা যাবে না। এজন্য সবসময় চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে মাসাজ করা উচিত।

মাসাজ নেওয়ার আগে শরীর ও মনকে স্বাভাবিক ও প্রশান্ত রাখতে হয়। ঢিলেঢালা পোশাক পরতে হয়। মাসাজ করার আগে ভরপেট খাওয়া যাবে না। আবার পেটে ক্ষুধাও থাকা যাবে না। হালকা খেয়ে মাসাজ করতে হবে।

ডা. লেলিন বলেন, অনেকের মধ্যে একটি ভুল ধারণা আছে। যেকোন রোগের একমাত্র চিকিৎসা হলো ওষুধ। এই ধারণা থেকে বের হয়ে আসতে হবে। রোগমুক্তির জন্য তিনটি বিষয় জরুরী- জীবনযাপন পদ্ধতির পরিবর্তন, সঠিক নিয়মে খাবার খাওয়া এবং ওষুধ খাওয়া। শুধু ওষুধের ওপর সবসময় নির্ভর করা উচিত না। মাসাজ এমন একটি উপায় যা অনেকক্ষেত্রে রোগমুক্তি ও কষ্ট কমাতে সাহায্য করে।

শারীরিক সমস্যাভেদে মাসাজ করতে হয়। আসুন জেনে নেই বিভিন্ন ধরনের মাসাজের উপকারিতা সম্পর্কে-

হট স্টোন মাসাজ

ব্যথা কমাতে, দেহে রক্ত সঞ্চালন বাড়াতে ও স্ট্রেস কমাতে হট স্টোন মাসাজ কার্যকর। ছোট নুড়ি বা পাথর গরম করে এই মাসাজ করা হয়। এজন্য নুড়িগুলো ১৩০ ডিগ্রি থেকে ১৪৫ ডিগ্রি তাপমাত্রায় গরম করতে হয়। এই মাসাজে শরীরের বিভিন্ন অংশের ব্যথা দূর হয় সহজেই। গরম পাথরের সাহায্যে পেশিতে প্রেসার দেওয়া হয়। ফলে শরীর থেকে টক্সিন বের হতে সাহায্য করে।

মাসাজের জন্য বিশেষ পাথর কিনতে পাওয়া যায়। গরম পানিতে এ পাথর দিলে তা উত্তপ্ত হয়ে উঠবে। উত্তপ্ত পাথরে অলিভ ওয়েল লাগিয়ে এর সাহায্যে বডি মাসাজ করা হয়।

অ্যারোমাথেরাপি মাসাজ

হতাশা, দুশ্চিন্তা দূর করতে অ্যারোমাথেরাপি মাসাজ অত্যন্ত কার্যকর। উদ্ভিজ্জ তেল দিয়ে এই মাসাজ করা হয়। এক্ষেত্রে চিকিৎসক আপনার ত্বকের ধরন অনুযায়ী তেল ব্যবহারের পরামর্শ দেবেন। পুরো শরীরে এই তেল ব্যবহার করে মাসাজ করতে হয়। তবে অনেকে অ্যারোমাথেরাপি মাসাজ করেন শুধুমাত্র মাথা, কাঁধ ও পিঠে। ৬০ থেকে ৯০ মিনিটের ধরে এই মাসাজ করা হয়।

ডিপ টিস্যু মাসাজ

ডিপ টিস্যু মাসাজের ফলে শরীরে দীর্ঘদিনের ব্যথা অর্থ্যাৎ ক্রনিক ব্যথা কমে যায়। আঘাতজনিত ব্যথা দূর করতেও এই মাসাজ উপকারি। ডিপ টিস্যু মাসাজ আমাদের দেহের টিস্যুগুলোকে সতেজ করে। অতিরিক্ত টেনশন ও মানসিক অস্থিরতার ক্ষেত্রেও এই মাসাজ কার্যকর। ডিপ টিস্যু মাসাজও ৬০ থেকে ৯০ মিনিট ধরে করতে হয়।

স্পোর্টস মাসাজ

খেলাধুলার আঘাতজনিত ব্যথার ক্ষেত্রে এই মাসাজ অত্যন্ত কার্যকর। খেলতে গিয়ে অনেক সময় মাংসপেশিতে টান লাগে। তখন এই মাসাজ করতে পারেন। তবে শুধু আঘাতজনিত ব্যথা দূর করতেই নয়, এই মাসাজ নিয়মিত করলে পেশির নমনীয়তা ও কার্যক্ষমতা বাড়ে। এই মাসাজ সম্পূর্ণ শরীরে করতে পারেন অথবা যেখানে ব্যথা সেখানেও করতে পারেন।

থাই মাসাজ

থাই মাসাজ করলে ক্লান্তি দূর হয়। শরীর হয় ঝরঝরে ও অবসাদমুক্ত। এতে সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক উপাদান ব্যবহার করা হয়। যা ত্বককে করে তোলে উজ্জ্বল ও সুন্দর।

সুইডিশ মাসাজ

দেহের টিস্যুগুলোতে রক্ত সঞ্চালন বাড়ায় এই মাসাজ। হাড়ে বা জয়েন্টে ব্যথা থাকলে সুইডিশ মাসাজ করাতে পারেন। নিয়মিত এই মাসাজ করলে স্ট্রোকের ঝুঁকি কমে যায়।

আয়ুর্বেদিক মাসাজ

আয়ুর্বেদিক মাসাজকে সংস্কৃতিতে আভিয়ানগাম বলা হয়। আয়ুর্বেদিক মাসাজ শরীর থেকে টক্সিন বের করতে সাহায্য করে। ফলে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ে। শরীরের ব্যথা কমাতে, অবসাদ দূর করতে, বয়সের ছাপ দূর করতে সাহায্য করে।

ধানমন্ডির হারমনি স্পা বিউটি সেলুনের কনসালটেন্ট ডা. মাহমুদা বলেন, এখানে মূলত তিন ধরনের মাসাজ আছে। রিলাক্সেশন, স্ট্রেস রিলিফ ও ব্যথা কমানোর জন্য মাসাজ করানো হয়।

রিলাক্সেশন মাসাজ

অনেক সময় লম্বা ভ্রমণের পর পায়ে, কোমরে ব্যথা হয়। অনেকক্ষণ বসে থাকার কারনে এটা হয়। আবার কারও কারও ব্যাক পেইন আছে। সেক্ষেত্রে রিলাক্সেশন মাসাজ অনেক কার্যকর। এক বা দুইটা মাসাজ করলে ব্যথা অনেকটা কমে যায়।

স্ট্রেস রিলিফ

যাদের ঘুমের সমস্যা আছে তাদের স্ট্রেস রিলিফ মাসাজ দেওয়া হয়। শিরদাঁড়া ও চক্রদাঁড়া এই দুটো পদ্ধতিতে স্ট্রেস রিলিফ মাসাজ করা হয়। ডোপামিন এক ধরনের হরমোন। এই হরমোনের কারনে স্ট্রেস বাড়ে। স্ট্রেস রিলিফ মাসাজ করলে দেহের স্নায়ু থেকে ডোপামিন হরমোন নিঃসরণ কমে যায়। এই মাসাজে প্রথমে তেল দিয়ে পুরো শরীর মাসাজ করা হয়। পরে কপালে ওয়েল পুরিং ধারা দেওয়া হয়।

ব্যথা কমানোর জন্য মাসাজ

ব্যথা কমানোর জন্য ধানমন্ডির হারমনি স্পা বিউটি সেলুনে মূলত চার ধরনের মাসাজ আছে। পডিকিজি ও ইলাকিজি, হট স্টোন আভিয়ানগাম, গ্রীবা ভাস্তি এবং কাটি ভাস্তি। পডিকিজি ও ইলাকিজি এবং হট স্টোন আভিয়ানগাম শরীরের জয়েন্টে ব্যথা ও মাংসপেশির ব্যথা দূর করতে সাহায্য করে। গ্রীবা ভাস্তি মাসাজ ঘাড় ব্যথা কমাতে ও কাটি ভাস্তি মাসাজ কোমরের ব্যথা কমাতে সাহায্য করে। শরীরের যে অংশে ব্যথা শুধু সেখানেই এই দুটি মাসাজ করা হয়। হারমনি স্পা বিউটি সেলুনে প্রতিবার মাসাজ করতে ধরনভেদে ২৫০০ থেকে ৪০০০ টাকা লাগে।

হারমনি স্পাতে মাসাজ নিতে এসেছেন নাহিদা। তিনি বলেন, এখানে দুইবার হট স্টোন মাসাজ করেছি। বেশ ভাল উপকার পাচ্ছি। আমার মাংসপেশিতে খুব ব্যথা ছিল। মাসাজ করে ব্যথা অনেকটা কমে গেছে। প্রতিমাসে একবার মাসাজ করাই। তবে এখানে খরচ অনেক বেশি। খরচ একটু কম হলে আরও অনেক মানুষ এখানে আসতে পারতো।

ডা. মাহমুদা বলেন, নাভারেকিজি নামে একটি মাসাজ আছে। এটি ত্বক উজ্জ্বল করতে সাহায্য করে। আবার যাদের হাড় ক্ষয় গেছে তাদের জন্যও এই মাসাজটি কার্যকর। চালের গুঁড়া, দুধ ও বিভিন্ন ধরনের প্রাকৃতিক উপাদান দিয়ে এই মাসাজটি করানো হয়। তিনি বলেন, আমাদের এখানে সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক উপাদান ব্যবহার করে মাসাজ করানো হয়। ফলে মানুষ উপকার পাচ্ছে।

মাহমুদা আরও বলেন, অনেকে ক্রনিক ব্যথা নিয়ে আমাদের এখানে আসে। সেক্ষেত্রে রোগীকে অবশ্যই তার ব্যথার কারন অনুসন্ধান করার পরামর্শ দেই আমরা। যদি বড় কোন রোগ না থাকে, শুধুমাত্র মাংসপেশি ও জয়েন্টে ব্যথা থাকে তাহলে মাসাজ অনেক কার্যকর। সাধারণ ব্যথার ক্ষেত্রে একটি বা দুটি মাসাজ করলেই ব্যথা অনেক কমে যায়। আর ক্রনিক ব্যথার জন্য মাসে একটি বা দুটি মাসাজ করতে হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *