স্বাস্থ্য

গর্ভের সন্তান ছেলে না মেয়ে তা গোপন রাখতে নতুন আইন!

বাংলাদেশে সন্তান জন্মের আগে গর্ভস্থ সন্তান ছেলে না মেয়ে, তা নিয়ে উদ্বেগে থাকে অনেক পরিবার। দেখা যায়, লিঙ্গ পরিচয় জানতে আল্ট্রাসনোগ্রাম করানোর সময় মেয়ে সন্তান হবে জানলে অনেক পরিবারের সদস্যই আশাহত হন বা ভেঙে পড়েন।

এমন কী সে সব ক্ষেত্রে গর্ভবতী মা শ্বশুরবাড়িতে শারীরিক, মানসিক বা নানা ধরনের অত্যাচারেরও শিকার হয়, যা তার প্রেগন্যান্সিকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলতে পারে।

এমন সামাজিক প্রেক্ষাপটেই দেশের স্বাস্থ্য অধিদফতর সম্প্রতি একটি নীতিমালা তৈরি করে হাইকোর্টে জমা দিয়েছে।

এই নীতিমালা চেয়ে হাইকোর্টে আবেদন করেছিলেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ইশরাত হাসান।

২০১৮ সালে নিজের গর্ভকালীন সময়ে ডায়াগনস্টিক সেন্টারে অন্যদের যে অভিজ্ঞতা দেখেন তার ভিত্তিতেই এই আবেদন করা হয় বলে জানান তিনি।

তিনি বলেন, ‘ঢাকার একটি ডায়াগনস্টিক ক্লিনিকে ২০১৮ সালে নিজের গর্ভজাত সন্তানের অবস্থা দেখতে আল্ট্রাসনোগ্রাম করাতে যাই। ওই রুমে থাকা অবস্থায় আরেকজন মহিলাকে আল্ট্রাসনোগ্রাম করানো হচ্ছিলে তখন।’

‘সাথে থাকা মহিলা বারবারই সন্তান ছেলে না মেয়ে জানতে চাচ্ছিলেন। যখন তাকে জানানো হয় মেয়ে, কাঁদতে কাঁদতে দৌড়ে বাইরে চলে যান তিনি।’

ওই আইনজীবী জানান, ‘আল্ট্রাসনোগ্রাম রুম থেকে বের হয়ে জানতে পারেন ওই ঘটনার আগেও গর্ভে কন্যা শিশু থাকায় বিক্ষুব্ধ হয়েছেন পরিবারের অন্যরা, এমন ঘটনা আগেও অনেক ঘটেছে।

পরবর্তীতে ২০২০ সালের ২৬ জানুয়ারি গর্ভের শিশুর লিঙ্গ পরিচয় শনাক্তকরণের পরীক্ষা ও পরিচয় প্রকাশ বন্ধের নির্দেশনা চেয়ে রিটটি করা হয়। এরপর ওই বছরই নীতিমালা তৈরি করতে রুল দেয় আদালত।

আইনজীবী ইশরাত হাসান বলেন, ‘আমাদের দেশে সাধারণত ছেলে শিশুর আকাঙ্ক্ষাই বেশি থাকে। গ্রামে এ ঘটনা আরো বেশি। আল্ট্রাসনোগ্রামে শিশুর পরিচয় মেয়ে জানতে পারলে গর্ভবতী নারীর উপর আরো অত্যাচার নেমে আসে।’

‘বিভিন্ন গবেষণায় দেখা দেখা গেছে, অনেক মহিলারাও চান না তার গর্ভের সন্তান মেয়ে হোক।’

‘বাংলাদেশে যেমন চাইলেই আল্ট্রাসনো করে জানা সহজ। কিন্তু বিশ্বের অনেক দেশেই এটা নিষিদ্ধ’, বলছিলেন তিনি।

এক ভুক্তভোগীর কথা
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন বেসরকারি চাকুরীজীবী নারী বিবিসি বাংলাকে নিজের গর্ভকালীন তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা জানান।

২০২০ সালে দ্বিতীয়বারের মতো গর্ভধারণ করেছিলেন তিনি। তার স্বামী বাংলাদেশের একজন প্রথম শ্রেণির সরকারি কর্মকর্তা, যিনি র‍্যাবের প্রধান কার্যালয়ে কর্মরত।

তিনি বলেন, ‘পাঁচ মাসের গর্ভকালীন সময়ে স্বামীর সাথে আমি ঢাকার একটি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে আল্ট্রাসনোগ্রাম করাতে যাই। তখন আমার স্বামী বার বার ডাক্তারের কাছে জানতে চায় ছেলে হবে না কি মেয়ে। কারণ ছেলে হলে ওই সন্তান রাখবেন নতুবা গর্ভপাত করাবেন।’

ওই ভুক্তভোগীর ভাষ্য অনুযায়ী, যখন তাকে বলা হল গর্ভের সন্তান মেয়ে তখন তার স্বামী তাকে জানায় মেয়ে বাচ্চা রাখা যাবে না, নষ্ট করে ফেলতে হবে।

এমন কী গর্ভপাত করাতে মগবাজারে একটি হাসপাতাল, ডাক্তার সব ঠিক করে রাখেন তার স্বামী।

আল্ট্রাসনোগ্রামের পরে বাসায় এসে তাকে গর্ভপাত করাতে আরো মানসিক অত্যাচার করা হয়। এক পর্যায়ে তার পেটে, কোমরে লাথি মারেন তার স্বামী। পরে তিনি নিজেকে বাঁচাতে বাথরুমে গিয়ে দরজা আটকে ফেলেন।

বাথরুম থেকে ‘৯৯৯’ এ ফোন করে পুলিশের সহায়তা চান ওই ভুক্তভোগী।

তিনি বলেন, ‘প্রথমে স্বামী পুলিশ কর্মকর্তা এ কথা তাদের বলিনি। লোকেশন বলেছি রমনা। পরে তারা যখন পুলিশ অফিসার্স মেসে রয়েছি জানতে পারে আমাকে বলে সেখানকার রিসিপশনে ফোন দিয়ে সাহায্য চাইতে। কারণ এটা বিভাগীয় ব্যাপার।’

‘আবারো অনুরোধের পর তারা আসতে রাজি হয়। এ সময় রুমের ভেতর থাকা আমার স্বামী সব শুনছিল। পরে পুলিশ এসে বের হতে বললে আমি বাথরুম থেকে বের হই’, বলছিলেন ওই ভুক্তভোগী।

পরে তিনি রমনা থানায় মামলা করেন। যেই মামলায় তার স্বামী তিন মাস কারাভোগ করেছেন বলে জানান তিনি।

একইসাথে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা চলছে। চাকরি থেকে তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।

যা রয়েছে নীতিমালায়
এরই মধ্যে স্বাস্থ্য অধিদফতর অনুমোদনের পর ‘ন্যাশনাল গাইডলাইন রিগার্ডিং প্যারেন্টাল জেন্ডার সিলেকশন ইন বাংলাদেশ’ নামে নীতিমালাটি হাইকোর্টে জমা দিয়েছে।

যে নীতিমালাটি করা হয়েছে তাতে বলা হয়েছে, ‘কোনো ব্যক্তি, হাসপাতাল, ডায়াগনস্টিক সেন্টার, ল্যাবরেটরি কোনো লেখা বা চিহ্ন অথবা অন্য কোনো উপায়ে শিশুর লিঙ্গ পরিচয় প্রকাশ করতে পারবে না। এ বিষয়ে কোনো রকম বিজ্ঞাপন দেয়া যাবে না।’

‘ডাক্তার, নার্স, পরিবার পরিকল্পনা-কর্মী, টেকনিশিয়ান কর্মীদের নেতিবাচক ফলাফল সম্পর্কে সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় প্রশিক্ষণ দেবে। এছাড়া নৈতিকতা ও পেশাগত আচরণ বিষয়েও ট্রেনিং দেয়া হবে।’

এই নীতিমালায় আরো বলা হয়েছে, ‘হাসপাতাল, ডায়াগনস্টিক সেন্টার-সহ মেডিক্যাল সেন্টারগুলো এই সংক্রান্ত সব ধরনের টেস্টের তথ্য সংরক্ষণ করে রাখবে।’

‘ডিজিটাল ও প্রিন্ট মাধ্যমে লিঙ্গ সমতা ও কন্যা শিশুর গুরুত্ব তুলে ধরে বিভিন্ন ধরণের মেসেজ প্রচার করবে হাসপাতাল, ডায়াগনস্টিক সেন্টার-সহ মেডিক্যাল সেন্টারগুলো।’

এই নীতিমালার উদ্দেশ্য হলো গর্ভাবস্থার যেকোনো সময়ে ভ্রূণের লিঙ্গ নির্ধারণের জন্য প্রি-নেটাল ডায়াগনসিস পদ্ধতি এবং প্রি-নেটাল ডায়াগনসিস টেস্টের অপব্যবহার রোধ করা।

পাশাপাশি ভ্রূণের লিঙ্গ নির্বাচনের জন্য প্রজনন চিকিৎসার অপব্যবহার রোধে সচেতনতা তৈরি করা।

এর আরেকটি উদ্দেশ্য হলো লিঙ্গ সমতা এবং কন্যা শিশুদের মূল্যায়ন সম্পর্কে সচেতনতা এবং জ্ঞান বৃদ্ধি করা।

এছাড়াও বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিলের ‘পেশাদার আচরণবিধি, শিষ্টাচার এবং এথিকস’ এর বিষয়ে মূল স্টেকহোল্ডারদের সংবেদনশীল করাও এই নীতিমালার লক্ষ্য।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রসূতি ও স্ত্রী রোগ বিভাগের অধ্যাপক রেজাউল করিম কাজল ‘বিএমডিসির কোড অব এথিকস অনুযায়ী, শিশুর লিঙ্গ পরিচয় প্রকাশ করা যায় না।’

‘কিন্তু রোগী ও তার স্বজনদের পীড়াপীড়িতে তা বলা হয় নতুবা তারা অভিযোগ করেন। তবে চিকিৎসকরা মুখে বলেন, লিখিতভাবে কিছু দেন না।’

কাজল মনে করেন, ‘শুধু নীতিমালা হলেই হবে না। আইনে শাস্তির ব্যবস্থা থাকতে হবে। যিনি জিজ্ঞেস করবেন ও যিনি বলবেন উভয়ের জন্যই পানিশমেন্ট থাকতে হবে।’

বাংলাদেশে যে অবস্থা

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পপুলেশন সায়েন্স বিভাগের ২০১৯ সালে করা একটি গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে ২৮ শতাংশ নারী প্রথম সন্তান হিসেবে ছেলে চায়, যা পুরুষদের ক্ষেত্রে ২৪ শতাংশ।

১৯৯৩-৯৪ সাল থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত দেখা যায়, লিঙ্গভিত্তিক পছন্দে ছেলে সন্তান হোক, তা বেশি প্রাধান্য পেয়েছে।

১৯৭৫ সাল থেকে ১৯৯৪ সালের মধ্যে জন্ম নেয়া বাংলাদেশী নারীদের পছন্দে কিভাবে ছেলে সন্তান প্রাধান্য পায় তা আরেকটি গবেষণায় দেখা গেছে। ছেলে বেশি পছন্দ হওয়ার কারণে লিঙ্গ ভারসাম্যের ক্ষেত্রে নারী শিক্ষা ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধি হয়েছে।

যদিও দেশে এখনো ছেলেদের পছন্দেই ফার্টিলিটির সিদ্ধান্তগুলো নেয়া হয়।

এতে বলা হয়েছে, ‘জেন্ডার বেইজড সেক্স সিলেকশন’ একটা ক্ষতিকর জেন্ডার নির্ধারণের ধারণা।

এই ক্ষতিকর ধারণা পিতৃতান্ত্রিক, পুরুষতান্ত্রিক বিষয় দ্বারা নির্ধারিত হয়। যাতে উত্তরাধিকার ও সম্পত্তির অধিকারও অন্তর্ভুক্ত।

এই কারণগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সন্তান জন্মদানের উর্বরতা হ্রাস এবং লিঙ্গ শনাক্তকরণ প্রযুক্তিও থাকতে পারে।

ওই গবেষণায় বলা হয়েছে, এই ‘জেন্ডার বেইজড সেক্স সিলেকশন’ বা ‘জিবিএসএস’ ক্ষতিকর প্রাকটিস হিসেবে স্বীকৃত। যা নারীর মৌলিক অধিকারকে ক্ষুণ্ণ করে।

অসম শ্রেণির সম্পর্ক, পিতৃতন্ত্র, যৌতুক প্রথা, সাংস্কৃতিক বিশ্বাস, নারীর উপর চাপ, সামাজিক নিরাপত্তাহীনতা, ঐতিহ্যগত লিঙ্গ ভূমিকাও বাংলাদেশের মানুষকে ছেলে কামনা করতে বাধ্য করে। একই সাথে মেয়ে শিশুর মূল্যকে ক্ষুণ্ণ করে।

অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, নারীর প্রতি বৈষম্য ও সহিংসতার কারণও ছেলে পছন্দ করার জন্য হয়।

২০১৯ সালের এই গবেষণায় প্রকাশ করা হয়, নারীরা অপমান, যত্নের অভাব, অতিরিক্ত চাপ এমন কী শারীরিক সহিংসতা-সহ বিভিন্ন বৈষম্যমূলক আচরণের মুখোমুখি হন।

এই সব কারণের সাথে সাথে দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশে পরিবারের আকার তুলনামূলকভাবে ছোট হচ্ছে, নিম্ন উর্বরতার হারও বাড়ছে। এর ফলে ‘জেন্ডার বেইজড সেক্স সিলেকশন’ এর চাপ আরো বেশি প্রকট হয়ে উঠেছে।

এছাড়াও প্রযুক্তির প্রাপ্যতা এই জিবিএসএস, আলট্রাসাউন্ড, অন্যান্য লিঙ্গ নির্ধারণের প্রযুক্তি, গর্ভপাত, গর্ভ নিরোধক পদ্ধতি এবং অবাঞ্ছিত গর্ভধারণের পর গর্ভপাতের বিস্তৃত সুযোগ তৈরি করতে পারে।

ফলে উর্বরতা হ্রাস ও প্রযুক্তির প্রাপ্যতা এই ‘জেন্ডার বেইজড সেক্স সিলেকশন’বা ‘জিবিএসএস’ এর সম্ভাব্য ঝুঁকি এড়ানোকে আরো জটিল করে তুলেছে।

চীন ও ভারত-সহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পেটে থাকা সন্তানের লিঙ্গ পরিচয় প্রকাশের ওপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের জমা দেয়া নীতিমালার উপর হাইকোর্টে আগামী সপ্তাহে শুনানি হওয়ার কথা রয়েছে বলে জানান রিট দায়েরকারী আইনজীবী ইশরাত হাসান।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *