রাজনীতিশিল্প ও সাহিত্য

সত্যকে মিথ্যা দিয়ে চাপা দেওয়া যায় না: প্রধানমন্ত্রী

সত্যকে কখনো মিথ্যা দিয়ে চাপা দেওয়া যায় না উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ইতিহাসের পথ বেয়ে বাংলাদেশ সামনের দিকে এগিয়ে যাবে এবং জাতির পিতার স্বপ্নের সোনার বাংলাদেশ হিসেবে গড়ে উঠবে।

শুক্রবার (৭ সেপ্টেম্বর) বিকেলে প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন গণভবনে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেমোরিয়াল ট্রাস্ট থেকে প্রকাশিত গ্রন্থের ১ খণ্ড (১৯৪৮-১৯৫০) প্রকাশনা উৎসবে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি একথা বলেন।

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু মেমোরিয়াল ট্রাস্টের সভাপতি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন শেখ হাসিনা ছিলেন। ইমেরিটাস অধ্যাপক রফিকুল ইসলামের সভাপতিত্ব অনুষ্ঠানে আলোচক হিসেবে বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খান এবং জাতির জনক বঙ্গবন্ধু মেমোরিয়াল ট্রাস্টের সদস্য সচিব শেখ হাফিজুর রহমান, পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) ড. মোহাম্মদ জাবেদ পাটোয়ারী, হাক্কানী পাবলিশার্সের প্রকাশক গোলাম মোস্তফা, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু স্মৃতি যাদুঘরে’র কিউরেটর মো. নজরুল ইসলাম।

এছাড়াও সামনের সারিতে উপস্থিত ছিলেন বঙ্গবন্ধুর ছোট কন্যা শেখ রেহানা ও বঙ্গবন্ধুর নাতি রেদওয়ান মুজিব সিদ্দিকী ববিসহ পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা স্বাধীনতা সংগ্রামে জাতির পিতার ভূমিকার কথা স্মরণ করে বলেন, ‘কিন্তু সবসময় স্বাধীনতা নিজে বিশ্বাস করতেন এবং অপরের স্বাধীনতা বিশ্বাস করতেন। স্বাধীনতা শুধু ভোগ করবার জন্য নয়। স্বাধীনতা অনেক দায়িত্বেও বর্তায়; সেই দায়িত্বটা পালন করা এবং দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া, এটাই হচ্ছে মূল কথা।’

‘২১ বছর আমাদের জীবন থেকে হারিয়ে গেছে, আওয়ামী লীগ সরকারে আসার পর থেকে এই দেশের উন্নয়নের যাত্রা শুরু। মাঝখানে আবার ৭ বছর হারিয়ে ছিলাম। কিন্তু ২০০৯ সালের পর থেকে ২০১৮ সাল আজকের বাংলাদেশ বিশ্বে উন্নয়নের রোল মডেল হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে। যে পাকিস্তানকে আমরা যুদ্ধ করে পরাজিত করেছিলাম, আজকে সেই পাকিস্তানের অনেক বুদ্ধিজীবী বলছে, আমাদেরকে বাংলাদেশ বানিয়ে দাও।’

‘অর্থাৎ বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে, এগিয়ে গেছে এবং এগিয়ে যাবে। জাতির পিতার এত আত্মত্যাগ বৃথা যেতে পারে না। লাখো শহীদের রক্ত বৃথা যেতে পারে না। মানুষের আকাঙ্ক্ষা বৃথা যেতে পারে না’ বলে উল্লেখ করেন তিনি।

মহান মুক্তিযুদ্ধে অনেক বুন্ধুপ্রতিম দেশের সহযোগিতা পেয়েছি এবং এখনো পাচ্ছি স্বীকার করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমরা দেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে চাই, যেন জাতির পিতার স্বপ্নের সোনার বাংলাদেশ আমরা গড়তে পারি। আমরা স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী ২০২১ সালের মধ্য দেশকে ক্ষুধামুক্ত-দারিদ্রমুক্ত করব ঘোষণা দিয়েছি। আমরা ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে উন্নত সমৃদ্ধশালী করব, আমরা শত বছরের কর্মসূচি দিয়েছি, ডেলটা প্ল্যান-২১০০ অর্থ্যাৎ বাংলাদেশ কোনভাবে উন্নত হবে সে পরিকল্পনাও আমরা গ্রহণ করে কাজ করে যাচ্ছি। যেন বাংলাদেশের এ অগ্রযাত্রা অব্যাহত থাকে। জাতির পিতার স্বপ্ন পূরণ হয়।’

বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে লেখা আরও দুইটি বই প্রকাশিত হবে বলেও জানান বঙ্গবন্ধু কন্যা।

এছাড়াও শেখ রেহানার ছেলে তথা ভাগ্নে রেদওয়ান মুজিব সিদ্দিকী ববিকে ধন্যবাদ জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সে একটা উদ্যোগ নিয়েছিল। শুধুমাত্র বই আকারে বের করা না, আমাদের শিশু-কিশোর বা নতুন প্রজন্ম তাদের জন্য একটি উপযুক্ত গ্রাফিক্স নভেল তৈরি করা। তারা একটি টিম নিয়ে কাজ করে এবং তারা সেটা বের করে। এটাও দারুণভাবে আমাদের শিশু-কিশোরদের আগ্রহী ও আকর্ষণ করছে।

শেখ হাসিনা বলেন, ‘যে নামটা একেবারে মুছে ফেলে দিয়েছিল। সত্যকে কখনো মিথ্যা দিয়ে চাপা দেওয়া যায় না। সেটাই আজ প্রমাণ হয়েছে। আজকে এই নাম শুধু বাংলাদেশে না বিশ্বে উজ্জ্বল। কারণ ৭ মার্চের ভাষণ আজকে আন্তর্জাতিক প্রামাণ্য দলিলে স্থান পেয়েছে।’

প্রকাশনা উৎসবে আগত অতিথিদের প্রতি আন্তরিক অভিনন্দন ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘বাংলাদেশের ইতিহাস যেমন জানবে আর ইতিহাসের পথ বেয়ে আমরা সামনের দিকে এগিয়ে যাব। বাংলাদেশ, জাতির পিতার স্বপ্নের সোনার বাংলাদেশ হিসেবে গড়ে উঠবে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘আমি অত্যন্ত আনন্দিত যে, এটি আমি সকলের কাছে তুলে দিতে পারলাম। আশা করি এ ডকুমেন্টগুলো পেলে পরে এর ভেতর থেকেই বাংলাদেশের জনগণ সত্যটাকে আবিষ্কার করতে পারবে, বাংলাদেশের ইতিহাসকে জানতে পারবে।’

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য সারাটা জীবন সংগ্রাম করেছেন। তিনি তার ছাত্রজীবন থেকে প্রথমে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার জন্য সংগ্রাম করেন এবং পাকিস্তান হবার পরে যে শোষণ বঞ্চনা এ এদেশের মানুষ ভোগ করত, তার বিরুদ্ধে তার কণ্ঠ সবসময় উচ্চ ছিল। সবসময় তিনি জনগণের অধিকার আদায়ের কথা বলে গেছেন।

আন্দোলন, সংগ্রাম ও জনগণের কথা বলতে গিয়ে বঙ্গবন্ধুর বারবার কারাবরণ করার ঘটনা তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, ‘তাকে অনেক অত্যাচার নির্যাতনও সহ্য করতে হয়েছে। কিন্তু কখনো তিনি মাথা নত করেননি। জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠায় সর্বদা আত্মত্যাগ করে গেছেন।’

শেখ হাসিনা আরও বলেন, ‘বঙ্গবন্ধুর গোয়েন্দা সংস্থা সবসময় সক্রিয় ছিল। তিনি কোথায় যাচ্ছেন। কী করছেন। কী বলছেন। তার প্রতিটি ক্ষেত্রে গোয়েন্দা সংস্থা অর্থ্যাৎ পাকিস্তান ইন্টেলিজেন্স ব্রাঞ্চ তার বিরুদ্ধে রিপোর্ট তৈরি করত এবং রিপোর্ট পাঠাত। এই রিপোর্ট যে পাঠাত তারই ওপর ভিত্তি করে তার বিরুদ্ধে একটার পর একটা মামলা হয়ে বারবার তিনি কারাবন্দি ছিলেন।’

ধাপে ধাপে একটি জাতিকে স্বাধীনতা চেতনায় উদ্ধুদ্ধ করেন এবং তারই আহ্বানে সাড়া দিয়ে বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জন করে বলেও উল্লেখ করেন।

১৯৮১ সালে দেশে ফিরে আসার পর থেকে গণতন্ত্র ফিরে আনার সংগ্রামের কথা তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, ‘১৯৭৫’র পর জাতির পিতার নাম নেওয়া নিষিদ্ধ ছিল। ২১ বছর পরে সরকারে আসি। সরকারে আসার পরে একটা তথ্য পেলাম। এসবি’তে তখন আমরা শামসুদ্দিন সাহেবকে নিয়োগ দিয়েছিলাম। ওনাকে আমি দাওয়াত দিয়েছি উনি বোধহয় নিশ্চয়ই এসেছেন। তিনি আমাকে বললেন, এইরকম বেশকিছু ফাইল আছে, তথ্য আছে। এই ফাইল থেকেই কিছু ফাইল চেয়েছিল আমাদের কিবরিয়া সাহেব (সাবেক অর্থমন্ত্রী) এবং মোনায়েম সাহেব। তারা একটা গবেষণা প্রতিষ্ঠান করবেন। সেখানে তারা কিছু তথ্যের জন্য ফাইল চায়। আমি সরকার প্রধান আমার পারমিশন ছাড়া ফাইল নিতে পারে না। শামসুদ্দিন সাহেব আমাকে যখন বললেন, আমি সমস্ত ফাইলগুলো নিয়ে আসি তখন। এটা ১৯৯৬ থেকে ২০০১ যখন ক্ষমতায় ছিলাম এবং সেগুলো ফটোকপি করি। তিনটা সেট তৈরি করি। একটা সেট আমি আলাদা ট্রাঙ্ক ভরে রেখে দেই একটা সিক্রেট জায়গায়। আর একটা সেট আমার কাছেই রাখি। আরেকটা সেট আমি আমেরিকায় ড. এনায়েত করিম সাহেব বঙ্গবন্ধুর উপরে তখন গবেষণা শুরু করেন তার কাছে নিয়ে যাই। তার কাছে দিয়ে দেই।

আমাদের কাছে যে কপিগুলো ছিল আমি আর বেবী মওদুদ, আমরা বসে বসে সেগুলো দেখে কাজ শুরু করি এবং সেখান থেকে অনেক তথ্য আমরা সংগ্রহ করতে শুরু করি। কাগজগুলো অত্যন্ত ছেঁড়া অনেক লেখা আমরা পড়তে পারতাম না। খুবই দুরূহ। যেহেুত পুলিশের ভাষা অনেক কিছু বুঝতাম না বা তাদের লেখা বোঝাও সম্ভব না। অনেক জায়গায় নষ্ট হয়ে গেছে। এগুলো ফটোকপি করাও খুব কঠিন ছিল। এই গণভবনে আমি দুটো ফটোকপি মেশিন কিনি এবং বেবী মওদুদের নেতৃত্বে একটা টিম তৈরি করে দেই।

দ্বিতীয়বারে আমি যখন সরকারে আসলাম, সরকারে আসার পরেই আমি তখন পুলিশের জাবেদ পাটোয়ারী তাকে আমি এই তথ্যটা দিয়েছিলাম, এখানে খুব মূল্যবান জিনিস রয়ে গেছে। আমরা সেগুলো পাবলিশড এবং প্রকাশ করতে চাই।

এ বিষয়ে জাবেদ পাটোয়ারীসহ ২২ জনের টিমকে ধন্যবাদ জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, ‘কত কষ্ট করে এ লেখাগুলো উদ্ধার করা, কত কষ্ট করে তারা এগুলোকে প্রস্তুত করেছে। কারণ এটা অনেক কঠিন কাজ।’

এ সময় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের অসমাপ্ত জীবনী নিয়ে কাজ করার অভিজ্ঞতার বিষয়টি তুলে ধরে বলেন, ‘প্রায় ৪৬টি ফাইল। ৪৯ হাজারের মতো পাতা। সেগুলোকে বসে বসে এডিট করে করে, যেগুলো খুবই গুরুত্বপূর্ণ সেগুলো নিয়ে আজকের এ প্রকাশনাটা করতে পেরেছি।’

তিনি আরও বলেন, ‘তারা পুলিশে চাকরি করেন কিন্তু তাদেরকে আমি আর এখান থেকে নড়তে দেইনি। তাদের বলেছি, এখানেই বসে থাকতে হবে, এ কাজই করতে হবে। তাদের জীবনে আবার ক্ষতি না হয় অবশ্যই সেটা আমি দেখব। কিন্তু তারাও কাজ করতে করতে তাদের ভেতরে এমন একটা অনুভূতির সৃষ্টি হয়ে গিয়েছিল, যে তারা নিজেরাও এ কাজের সঙ্গে খুব আন্তরিকতার সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে গিয়েছিলেন।’

শেখ হাসিনা বলেন, ‘এই ডকুমেন্টের মধ্য দিয়ে তিনি (বঙ্গবন্ধু) যে কাজগুলো করে গেছেন। তার অনেক কিছু আমরা পাবো। কারণ এটা তো ওনার পক্ষের কিছু না। সবই তার বিরুদ্ধে রিপোর্ট। আর এই বিরুদ্ধে রিপোর্টের মধ্য থেকেই কিন্তু আমরা মনে হয় যে, আমরা সবথেকে মূল্যবান তথ্য আবিষ্কার করতে পারব। যেমন-কয়লার খনি খুঁড়ে খুঁড়ে হীরে বের হয়ে আসে।’

‘আমার মনে হয়েছে যে, ঠিক সেইভাবেই যেন আমরা হীরার খনি আবিষ্কার করতে সক্ষম হয়েছি। আজকে আমি অত্যন্ত আনন্দিত যে, এটা আমি সকলের কাছে তুলে দিতে পারলাম। বাংলাদেশের জনগণ জানতে পারে।’

কারণ স্বাধীনতার পর জাতির পিতা স্বাধীনতার সুফল বাংলার ঘরে ঘরে পৌঁছে দেওয়ার কার্যক্রম হাতে নিয়েছিলেন তখনই তাকে হত্যা করা হয়। আর তার পর থেকে ইতিহাস থেকে তাকে সম্পূর্ণ মুছে ফেলা হয়েছিল। তার নাম নেওয়াটা নিষিদ্ধ ছিল।

ভাষা আন্দোলন নিয়েও এমনও কথা বলা হয়েছিল তিনি তো জেলে ছিলেন। ভাষা আন্দোলনে আবার কি করলেন? কাজেই এই যে মানুষের একটা বৈরী চিন্তা-ভাবনা। আমি আশা করি এ ডকুমেন্টগুলো পেলে পরে এর ভেতর থেকেই বাংলাদেশের জনগণ সত্যটাকে আবিষ্কার করতে পারবে, জানতে পারবে। অনেক সত্য ঘটনা জানতে পারবে। বাংলাদেশের ইতিহাসকে জানতে পারবে। কীভাবে আমরা এই স্বাধীনতাটা অর্জন করলাম।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *